সর্বশেষ সংবাদ
বরিশালের উন্নয়নের রূপকার শওকত হোসেন হিরনের জন্মদিন আজ
শেখ সাঈদ আহমেদ মান্না..

বরিশালের উন্নয়নের রূপকার শওকত হোসেন হিরনের জন্মদিন আজ

সম্পাদকীয়:

শেখ সাঈদ আহমেদ মান্না....

বরিশালের একজন স্বপ্নদ্রষ্টা রাজনীতিবিদ, উন্নয়নের রূপকার শওকত হোসেন হিরনের জন্মদিন আজ । তিনি ছিলেন।বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র এবং সদর আসনের সংসদ সদস্য। ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর জন্মগ্রহন করা হিরন মাত্র ৫৮ বছর বয়সে সকলকে কাঁদিয়ে চলতি বছরের ৯ এপ্রিল ইন্তেকাল করেন। শওকত হোসেন হিরনের মৃত্যুতে দেশ একজন দেশপ্রেমিক ও নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিককে হারিয়েছে। বরিশালের উন্নয়নে হিরনের ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। বরিশালের মানুষের জন্য তার ভালোবাসা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। উন্নয়নের স্থপতি হিরনকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বরিশালের মানুষ মনে রাখবে। এক সময়ের অবহেলিত বরিশাল শহরকে সাবেক মেয়র হিরন তার আন্তরিকতা ও অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রাচ্যের ভেনিসে পরিণত করেছিলেন। বরিশালের উন্নয়নে তার ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। বরিশালের মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা ছিলো অকৃত্রিম। বরিশালের মানুষ তাকে চিরদিন গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করবে। হিরনের মৃত্যুতে বরিশাল হারিয়েছে একজন স্বপ্নদ্রষ্টা রাজনীতিবিদকে, উন্নয়নের রূপকারকে।  হিরনের মৃত্যুতে বরিশাল বাসী হারিয়েছে একজন শক্তিশালী সংগঠককে, দেশ হারিয়েছে একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিককে। ২০১৩ সালের ১৫অক্টোবরও জন্মদিনে দলীয় নেতাকর্মীসহ সকলের ভালবাসায় সিক্ত হয়েছিলেন শওকত হোসেন হিরন। তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করেছিলেন সকলে। কিন্তু হঠাৎ করে বুকভরা অভিমান নিয়ে হিরন চলে গেছেন না ফেরার দেশে। জ্ন্ম দিনের প্রাক্কালে অনেকের মতো আমরাও গভীর শ্রদ্ধায় স্মরন করছি তাকে।
১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর শওকত হোসেন হিরণ বরিশাল নগরীর আলেকান্দায় মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর আব্দুল হাসেম সরদার এবং মাতা গৃহিনী জয়নব বেগম। চার পুত্র ও ছয় কন্যার মধ্যে তিনি তৃতীয়। তাঁর পৈতৃক নিবাস পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার কালীশুরি ইউনিয়নের আড়াইনাও গ্রাম হলেও শৈশব থেকে শুরু করে তার সারাজীবন কেটেছে বরিশাল নগরীর আলেকান্দায়। তিনি নগরীর নুরিয়া হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাস করেন। এরপর বি এম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং স্নাতক পাস করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি বরিশাল ল’ কলেজ থেকে এলএলবি পাশ করেন।
হিরন বসবাস করতেন নগরীর রিফুজী কলোনী এলাকার ডেঙ্গু সরদার রোডের ওহাব বাড়ির ‘হিরন পয়েন্ট’ নামের বাসায়। পেশায় তিনি ছিলেন ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী। এছাড়া তিনি সাউথ এ্যাপোলো মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল লিমিটেড, বেলস লিমিটেড, বেলস ফার্মা ইউনানি প্রাইভেট লিমিটেড, অ্যাভান্স অ্যাসোসিয়েট প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান, এইচ পি এল ও এইচ পি এল শিপিং এবং সাউথ বেঙ্গল পরিবহনের সত্ত্বাধিকারী, সাউথ এ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক কমপে¬ক্স প্রাইভেট লিমিটেড ও বেলভিউ মেডিক্যাল সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালকসহ অন্তত ১১টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন। বরিশাল ল’ কলেজ থেকে এলএলবি পাশ করার পরে তিনি যোগ দেন জাসদ ছাত্রলীগে। ১৯৭৯ সালে বিএনপির ছাত্ররাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন।  পরে  তিনি যোগ দেন এরশাদের জাতীয় পার্টিতে। এছাড়া তিনি বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠ উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে বরিশাল সদর উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য পদের নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ঐবছর অপর একটি উপ-নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হয়েছিলেন হিরন। ১৯৯৭ সালে ঐকমত্যের সরকারের শরীক দল জাতীয় পার্টির মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়। ফলে তিনি আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জেপি’র বরিশাল বিভাগের নেতৃত্বে আসেন। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন চীফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল¬াহর হাত ধরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের মাধ্যমে হিরণ যোগ দেন আওয়ামী লীগে। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বরিশাল সদর আসনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। চার দলীয় জোট সরকারের সময়ে বিরোধী দলের আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন তিনি এবং তা সক্রিয়ভাবে রাজপথে থেকে করেন। তাই যোগ্যতা বিবেচনা করে ২০০৩ সালে কেন্দ্রীয় কমিটি তাঁকে মহানগর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক মনোনীত করে। সাংগঠনিক দক্ষতা ও শক্তিশালী নেতৃত্ব দিয়ে তিনি মহানগরীর ৩০টি ওয়ার্ড এবং সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নকে নতুন করে সাজান। ২০০৮ সালের ৪ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিজয় অর্জন করেন এবং মেয়র নির্বাচিত হন। হিরণ তাঁর নিজের কার্যক্ষমতার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে টানা ৩৫ বছর পর বরিশাল নগর ভবনের নেতৃত্বে নিয়ে যান। ২০১৩ সালের ১৫ জুন বিসিসি’র নির্বাচনে তিনি বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী আহসান হাবিব কামালের কাছে পরাজিত হন। ২০১২ সালের সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বরিশাল সদর আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের ২২ মার্চ, শনিবার রাত ১০টায় হিরণের বরিশাল ক্লাবের সামনে ব্রেন স্ট্রোক হয়। এর সাথে সাথেই তিনি পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান এবং চেতনা হারিয়ে পড়েন। সাথে সাথেই তাঁকে শেরে বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকরা তাকে আইসিইউতে নিয়ে যান। পরে রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাঁর অবস্থার অবনতি হয়। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় এ্যাপোলো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই রোববার তাঁর মস্তিষ্কে ‘ডিকমপ্রেসিভ ক্রানেকটমি’ নামে একটি অস্ত্রোপচার করা হয়। এরপরে মেডিক্যাল বোর্ডের সিদ্ধান্ত নেয় এবং সেই অনুযায়ী সোমবার রাতে হিরণকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের গে¬নঈগলস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে মঙ্গলবার সকালে তার একটি অস্ত্রোপচার করা হয়। সেখানকার চিকিৎসকেরা হিরণের বাঁচার সব আশা ছেড়ে দেয় এবং বাংলাদেশে এনে লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলার পরামর্শ দেয়। পরবর্তী বৃহস্পতিবার রাতে দেশে ফিরিয়ে এনে পুনরায় অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যবস্থায় রাখা হয়। অবশেষে ৯ই এপ্রিল, ২০১৪; বুধবার সকাল সাতটায় তিনি ইন্তেকাল করেন।
বরিশালের উন্নয়নে হিরণ গুরুত্বপূর্ণ এবং উলে¬খযোগ্য অবদান রাখেন। রাস্তাঘাট, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, স্থানে স্থানে সবুজ পার্ক নির্মান ও বৃক্ষরোপণ করাসহ বেশকিছু পদক্ষেপ রাখেন তিনি। বরিশাল নগরীর বেশিরভাগ উন্নয়নমূলক কর্মসূচী তাঁর সময়েই সম্পাদিত হয়। এছাড়া
তিনি তাঁর এলাকায় বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সমঝোতা বজায় রেখেছিলেন।
তাই আজ বরিশালের স্বপ্নদ্রষ্টা রাজনীতিবিদ হিরন’টা জ্ন্ম দিনের প্রাক্কালেতা সকল বরিশা্লবাসির মতো আমরাও গভীর শ্রদ্ধায় স্মরন করছি তাকে।

Leave a Reply