সর্বশেষ সংবাদ
মৃত্যু জয়ের পর শান্তি জয় মালালার

মৃত্যু জয়ের পর শান্তি জয় মালালার

মৃত্যুর কোল থেকে বেরিয়ে এসে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা তার। এ বিশ্ব হবে শান্তির আর তাই তো মৃত্যুঞ্জয়ী সে। যে সময় স্কুলে যাওয়া ‍আর পুতুল খেলার, সে বয়সে ভাবনার খোরাকের মাধ্যমে নিজের জীবনকেই সঁপে দেওয়া। একি সাহসিকতা! এমন সাহসিকতা প্রদর্শনের এক জ্বলন্ত উপমার কথাই বলছি।

মেয়েটাকে গুলি করা হলো। সে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। এমন পরিস্থিতি যে; সে বাঁচতেও পারে, আবার নাও বাঁচতে পারে। ‍আর যারা গুলি করেছে, তারা ততক্ষণে দায় স্বীকার করে ঘোষণাও দিয়ে ফেলেছে মেয়েটি যদি এ যাত্রায় বেঁচে যায় তাহলে আবার তাকে গুলি করা হবে। এটা অবধারিত। তাকে কোনোমতেই বাঁচতে দেওয়া হবেনা।

একদিকে মৃত্যুর সঙ্গে খেলা করে জীবনের দিকে এগিয়ে যাওয়া অন্যদিকে নিজের শান্তিময়তার ভাবনাকে আরো পোক্ত করা। সেই সঙ্গে রয়েছে হামলাকারী জঙ্গিদের অব্যাহত চোখ রাঙানি।

এমন বন্ধুর পথ মারিয়ে সারা বিশ্বে শান্তির জন্য উপমা হয়ে ওঠা নাম একটাই। আজ সে পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ নোবেল বিজয়ী। নাম মালালা ইউসুফজাই। জন্ম ১৯৯৭ সালের ১২ জুলাই পাকিস্তানের সোয়াত জেলার মিনগরা শহরে।

মাত্র ১৫ বছর বয়সে গোটা পৃথিবীর আশা ও সাহসিকতার প্রতীক হয়ে ওঠে এই মালালা। নিজ দেশ পাকিস্তানের তালেবান অধ্যুষিত সোয়াত উপত্যকার কিশোরী মালালা বিশ্ববাসীর নজরে আসে প্রথমে তার সাহসী লেখনির মাধ্যমে। আরো নজরে আসে ২০১২ সালের ৯ অক্টোবর। যখন তার ওপর চালানো হয় তালেবানি হামলা।

সেদিন তার স্কুল বাসে হামলা হয়। তালেবান বন্দুকধারী জঙ্গিরা গুলি চালায়। এতে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয় মালালা। তার দুই বান্ধবীও সামান্য আহত হয়।

মামালার অবস্থা বেশ গুরুতর ছিলো। হাসপাতালে নেওয়া হলেও জঙ্গিদের আবারো আক্রমণের ভয় ছিলো।  শেষে উন্নত চিকিৎসার ও নিরাপত্তার জন্য তাকে ৬ দিন পর ১৫ অক্টোবর যুক্তরাজ্যে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখানে বার্মিংহাম শহরের কুইন এলিজাবেথ হাসপাতালে ভর্তি দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে সে সুস্থ হয়ে ওঠে।

তালেবানরা ভেবেছিল ছোট্ট মালালাকে হত্যা করা না গেলেও গুলি খেয়েই থেমে যাবে সময়ের বলিষ্ঠ এই কন্ঠস্বর। এতে হয় তো থেমে যাবে পাকিস্তান তথা বিশ্বের বুকে দামামা সৃষ্টিকারী সব জঙ্গেগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিশ্ব প্রতিবাদ। কিন্তু তালেবানদের সে ধারণা ভুল প্রমাণিত করে মালালা হয়ে উঠলো আরও সুস্থ, আরও দৃঢ়।

এলিজাবেথ হাসপাতালে থেকেই তার মন শপথ নেয়, তালেবানরা যত আগ্রাসী হোক তার চেয়েও আগ্রাসী হয়ে তাদের বিরুদ্ধে তুলতে হবে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি।

এদিকে মালালার ওপর তালেবান হামলার পর নিন্দার ঝড় বইতে শুরু করে সারা বিশ্বে। যেন আরেকবার জেগে উঠেছে বিশ্ব বিবেক। প্রশ্ন ওঠে আমাদের এই আবাসস্থল (পৃথিবী) কোন পথে যাচ্ছে? জাগ্রত মানুষ নাড়া খায় এতে। শুরু হয় তালেবানদসহ সব ধরনের জঙ্গি তৎপরতার নিন্দা। পাশাপাশি প্রশংসায় মালালাকে সাধুবাদ দেওয়া।

হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর মধ্যখানে অবস্থানরত মালালা প্রসঙ্গে, ১৭ অক্টোবর হামলার নিন্দা জানায় বিখ্যাত অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি।

তিনি সে সময়ই মন্তব্য করেন, মালালাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া উচিত।

অন্যদিকে পপ সম্রাজ্ঞী ম্যাডোনা তার হিউম্যান নেচার গানটি মালালাকে উৎসর্গ করেছেন। এছাড়া ১০ নভেম্বরকে ‘মালালা দিবস’ ঘোষণা করা হয়।

মালালা। যার অর্থ, ‘দুর্দশা জর্জরিত’। কিন্তু কিশোরী মামলা নামটি সে সময় থেকে বিশ্বের বুকে যেন অলিখিত শান্তির প্রতিশব্দ হয়ে ওঠে।

তালেবানদের বিরুদ্ধে ১৫ বছর বয়সী কিশোরী মেয়েটির সাহসিকতাপূর্ণ ভূমিকার জন্য পশ্চিমা মিডিয়া তাকে পঞ্চদশ শতকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফরাসিদের নেতৃত্ব দেওয়া কিশোরী জোয়ান অব আর্কের সঙ্গেও তুলনা করে।

মূলত নারী শিক্ষা, বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা, সব ধরনের জঙ্গি ও অপতৎপরতা, ধর্ম নিরপেক্ষতাসহ নানা সামাজিক ইস্যুতে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন বিবিসির উর্দু ব্লগে মালালা তার আওয়াজ তোলে। এরপর বিশ্বের ‍অনেক নামকরা সংবাদ মাধ্যমে উর্দুর পাশাপাশি ইংরেজিতেও লিখতে থাকে সে।

তালেবানদের বিরুদ্ধে ছোট্ট মেয়ে মালালার লেখা ডায়েরিকে কেউ কেউ তুলনা করেন ‘আনা ফ্রাংক’র ডায়েরির সঙ্গে।

সে সময় পাকিস্তান সরকার মালালার হামলাকারীদের ধরিয়ে দিতে পারলে এক মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ও মালালার এ সাহসিকতার জন্য তাকে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় খেতাব সিতারা-ই-সুজাতে ভূষিত করে।

মালালার সব চিন্তা তার লেখা। চিন্তা থেকেই মালালা লেখালেখির পাশাপাশি জঙ্গির হুমকি থাকলেও স্কুলে যাওয়া শুরু করে। তাকে দেখে অন্য মেয়েরাও স্কুলে আসে। আবার জঙ্গি চোখ রাঙারনকে দূরে ঠেলে স্কুলগুলো মুখরিত হয়ে ওঠে। পাশাপাশি অনেক ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুল নতুন করে নির্মাণ করা হয়। একটি স্কুলের নাম হয় মালালার নামেই।

মালালা সারা পৃথিবীতেই নারী শিক্ষার কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিতি পায়। নিজের জীবনের বিনিময়ে বিশ্ব শান্তি কিনে আনা পায়রা মালালা সত্যিই মৃত্যুঞ্জয়ী। মৃত্যুঞ্জয়ী তিনি সময়ের প্রয়োজনেই। জীবনের পথ চলতে চলতে তার এ অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিই শান্তিতে নোবেল।

Leave a Reply