সর্বশেষ সংবাদ
আজ ভয়াল ১৫ নভেম্বর,প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের সপ্তমবার্ষিকী

আজ ভয়াল ১৫ নভেম্বর,প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের সপ্তমবার্ষিকী

ডেস্ক: ভয়াল ১৫ নভেম্বরের দুঃসহ স্মৃতি আজো কাঁদায় বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলবর্তী ৩০টি জেলার স্বজনহারা মানুষদের। প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের সপ্তমবার্ষিকী আজ শনিবার।

২০০৭ সালের আজকের এই দিনে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডর ভয়াবহ আঘাত হেনেছিল উপকূলবর্তী ৩০ জেলায়। লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল পুরো উপকূল। শতাব্দীর ভয়াবহ ওই ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারিয়েছিলের সাড়ে ৩ হাজার মানুষ। নিখোঁজ হন আরো সহস্রাধিক।

সরকারি হিসাবে ২০ লাখ ঘরবাড়ি ভেসে যায় পানির স্রোতে। প্রায় ৪০ লাখ একর জমির ফসল নষ্ট হয়। মৃত্যু হয়েছে ৪ লাখ ৬৮ হাজার গবাদিপশুর। পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলায় সিডরে প্রাণ হারিয়েছিল ১১৬ জন। ২ হাজার গবাদিপশুর সঙ্গে ভেসে গিয়েছিল ২০ হাজার হাস-মুরগি। উপজেলার ৫ হাজার ২০টি পরিবার সম্পূর্ণ রূপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঝালকাঠিতে সিডরে প্রাণ হারিয়েছে ৪৭ জন। খুলনা বিভাগের বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরায় মারা গেছে ৭০ হাজার গবাদিপশু।

সিডরে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বরিশালের পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরগুনা ও বাগেরহাট জেলার। সিডরের ভয়াবহতা এতই নির্মম হবে তা বুঝতে পারেনি উপকূলভাগের বাসিন্দারা। সিডরের মাত্র কয়েক মাস আগে সুনামির পূর্বাভাস ও তা আঘাত না হানায় সিডর নিয়ে আতঙ্ক ছিল না এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে। ১৫ নভেম্বর ছিল বৃহস্পতিবার।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও বঙ্গোপসাগরের কূল ঘেঁষে বসবাস করা বরগুনার পাথরঘাটা, আমতলী-তালতলী, পটুয়াখালীর বাউফল, কলাপাড়া, গলাচিপা, দশমিনা, কাকচিড়া, মাঝেরচর, পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালী ও ভোলার ঢালচর, কুকরি-মুকরি ও চরপাতিলার লোকজন আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে আগ্রহ দেখায়নি। চরমরানিন্দ্রা, হাসার চর ও আশার চরে মাছ ধরতে যাওয়া অস্থায়ীভাবে বসবাসকারী শত শত জেলে সেখানেই থেকে গিয়েছিলেন। অনেকেরই ধারণা ছিল শেষ পর্যন্ত তেমন কিছু হবে না।

বরিশাল মহানগরীও যেন মৃত নগরীতে পরিণত হয়। রাত ৮টা থেকে সাড়ে ৮টা পর্যন্ত কিছু কিছু যোগাযোগ সম্ভব হলেও রাত ৯টার পর আর কোনো যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না। দুর্গম চরগুলোর শুধু গবাদিপশু নয়, বন্যপ্রাণীও মারা গেছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাণ্ডব বাড়তে থাকে।

সিডরের পরদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দক্ষিণাঞ্চলে দেখা দেয় হাহাকার। লাশ খোঁজার পাশাপাশি খাবারের আশায় ত্রাণের সন্ধানে ছোটেন ক্ষুধার্ত মানুষ। কিন্তু গত ৭ বছরেও তাদের ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে সরকারি তরফ থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এরই মাঝে আবার ঘুরে এসেছে ভয়াল সেই স্মৃতির দিন।

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার দেউলি সুবিদখালীর সিকান্দার আলী ভয়াবহ ওই রাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, বাতাসের একটা মোচড়েই সবকিছু শেষ করে দিয়ে গেছে। বাকেরগঞ্জের ফলাঘর গ্রামের প্রতিবন্ধী আবুল হাওলাদারের পুত্রবধূ মুক্তা বলেন, রাতে স্বামীকে নিয়ে ঘুমিয়ে ছিলাম। গভীর রাতে ঝরের তা-বে আমার পাশেই লাশ হয়ে পড়ে থাকতে দেখেছি স্বামী রুবেল হাওলাদারকে। আর কিছুই বলতে পারবো না। কারণ তখন আমার সব শেষ হয়ে গেছে। সকালে মানুষের ঢল নামে আমাদের দেখতে।

তিনি আরো বলেন, আমার শ্বশুর প্রতিবন্ধী আবুল হাওলাদার আজ ভিক্ষা করে সংসার চালান। আমাদের সংসারে একমাত্র আয়ের উৎস ছিল রুবেল।

বাউফলের চর ফেডারেশনের খোরশেদ গাজী বলেন, সেদিন রাতে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ ৫ সন্তানকে হারিয়েছি। আজ আমার সংসারের হাল ধরার কেউ নেই। সেদিন এ চরের ৩৮ জন জীবন হারিয়ে ছিল।

রাজাপুরের নারিকেলবাড়িয়ার আনোয়ার হোসেন জানান, বাতাসের তা-ব এত ভয়াবহ হবে সন্ধ্যায় বুঝিনি। বাড়িতেই ঘুমিয়েছিলেন গালুয়ার নাসিমা বেগম। রাতের তা-বে পরিবারের কে কোথায় ছিল তা জানেন না। পরদিন সকালে ১০ বছরের শিশু সন্তান মাহমুদকে মৃত অবস্থায় কুড়িয়ে এনেছিলেন একটি গাছের নিচ থেকে।

বড় গালুয়া গ্রামের একই পরিবারের ৪ জনের মৃত্যু হয়। ওই উপজেলার রেবেকা ও ইউসুফ দম্পতি তাদের ২ সন্তানকে হারিয়ে দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে পার করেছেন ৭টি বছর। ভয়াবহ এসব স্মৃতি মনে উঠলে এখনো মূর্ছা যান দক্ষিণ জনপথের মানুষ। তবুও তাদের বেঁচে থাকতে হচ্ছে অজানা আশঙ্কার মাঝেই।

পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার এখনো নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। প্রকৃতির রুদ্ররোষকে মোকাবিলা করেই তারা বেঁচে থাকার দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে সব বঞ্চনা মেনে নিয়েছেন। পার করে দিয়েছেন সিডর পরবর্তী ৭টি বছর।

Leave a Reply