সর্বশেষ সংবাদ
অতিথি পাখির পাখার ঝাপটায় এখন আর আলোড়িত হয় না দুর্গাসাগরের পানি

অতিথি পাখির পাখার ঝাপটায় এখন আর আলোড়িত হয় না দুর্গাসাগরের পানি

সাঈদ বারীঃ বাবুগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মাধবপাশার দুর্গা সাগরের সেই ঐতিহ্য এখন আর নেই।অতিথি পাখির পাখার ঝাপটায় এখন আর আলোড়িত হয় না দুর্গাসাগরের পানি। বরিশালের হাজারো বছরের ঐতিহ্য বাবুগঞ্জের দূর্গা সাগরের চারপাশের গাছ কেটে বন পরিষ্কার করায় এ বছরও আসেনি কোন অতিথি পাখী। । তাছাড়া অতিথি পাখিদের অভয়ারন্য দূর্গা সাগর দিঘীটি বর্তমানে হারিয়েছে তার চির চেনা রুপ। বিগতদিনে এই দূর্গা সাগরে শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে আসত হাজার হাজার বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখি। তাদের সাথে ভ্রাতিত্ত আবদ্ধ হয়ে থাকত আমাদের দেশিয় পাখী গুলো। একটা সময় ছিল যখন শীত মৌসুম আসার সাথে সাথে দুর্গা সাগরে অতিথি পাখিরা ভিড় জমাতো।আর অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হতে দিঘীর পার।তাই দূর্গা সাগরের অতিথি পাখি দেখতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভীড় জমাত হাজারো পর্যটক পাখী প্রিয় মানুষ গুলো। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও অতিথি পাখির বিচরনে তৎকালীন দূর্গাসাগরকে বরিশাল জেলা প্রশাসক তার নিয়ন্ত্রনে নেন। সাগরপাড়কে সংরক্ষিত রাখতে ও পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে নির্ধারন করা হলো টিকিট। এর কিছু বছর পর্যন্ত দূর্গা সাগর পাড়ে অতিথি পাখির বিচরন থাকলেও পরিবেশ বিপর্যয় ও ক্রমেই বন উঝার হয়ে যাওয়ায় হারিয়ে গেছে অতিথি পাখির বিচরন। কমে গেছে পর্যটকদের পদচারনা।

এখন এ বিনোদন কেন্দ্রটির রূপ ও সৌন্দর্য দিন দিন পাল্টে যাচ্ছে। গত ৮ বছর পূর্বেও কিছু সংখ্যক অতিথি পাখি এসেছিলো এ সাগরে। এরপর থেকে আর দেখা মেলেনি অতিথি পাখি’র পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে না স্থানীয় পাখিদেরও। পাখি না আসার অন্যতম কারণ হিসাবে এলাকাবাসী ও বরিশালের পরিবেশ বিভাগ ধারনা করছে পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি পর্যটক ও স্থানীয় উচ্ছৃঙ্খল যুবকদের শিকারের কবলে পরে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও এই সাগরের পার্শ্ববর্তী বাবুগঞ্জ-বরিশাল-বানারীপাড়া সড়কে গাড়ীর হর্ণ বাজানো নিষেধ থাকলেও গাড়ীর চালকরা তার তোয়াক্কা করছে না। এই শব্দ দূষণ অতিথি পাখিদের এখানে না আসার আর এক কারণ। এক সময় দুর্গা সাগরের সুনাম ছিল পুরো দেশ ব্যাপী। এর অন্যতম কারণ ছিল অতিথি পাখিদের বিচরণ ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে। বিশেষ করে শীত মৌসুম এলে দেশে-বিদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এ পাখিদের বিচরণ দেখার জন্য দুর্গা সাগরে ভীড় জমাতো অসংখ্য পর্যটক ও দশর্নাথীরা। তখন হাজার হাজার অতিথি পাখি এ সাগরে পাখা মেলে ভেসে বেড়াত। সে যেন এক অপরূপ দৃশ্য। চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না। ধীরে ধীরে দুর্গা সাগরে সেই ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। পাখিদের হারিয়ে যাবার পর্যটকেরা আর আসেন না এই সাগরপাড়ে। বর্তমানে দূর্গা সাগরের অবস্থা খুবই করুন। পারিবারিক বিনোদন কেন্দ্র হিসাবে এ সাগরের সুনাম ছিল পুরো বরিশাল জেলা সহ গোটা দক্ষিণ অঞ্চলবাসীর কাছে। এখানে বিভিন্ন জায়গা থেকে দর্শনার্থীরা অতিথি পাখি দেখার জন্য সাগর পাড়ে আসছে কিন্তু অতিথি পাখির দেখা না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছে। উল্লেখ্য সর্বশেষ ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডরের আঘাতে দুর্গাসাগরের অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়ে। এরপর থেকেই আর কোন অতিথি পাখি দেখা যায়নি দুর্গাসাগরে। পাখির কলকাকলী কমে যাওয়ায় কমতে শুরু করেছে পর্যটকদের সংখ্যাও। এলাকাবাসী জানায়, পর্যটক ও স্থানীয় উচ্ছৃংখল যুবকদের অবাধ শিকারের কারণে পাখি শূন্য হয়ে পড়েছে এলাকা। বর্তমানে দুর্গাসাগর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা বরিশাল জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু সরকারের কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের উদ্যোগে এই দীঘিটির পুনঃখনন করা হয় । তিনি দুর্গাসাগরকে ঘিরে পর্যটন এলাকা গড়ে তোলার জন্য দীঘির তিনদিকে ৩টি ঘাট নির্মাণ করেন। দীঘির মাঝখানে ৬০ শতাংশ জায়গা জুড়ে একটি টিলা স্থাপন করা হয়। স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, দীঘি খননের সময় গ্রাম্য রেওয়াজ অনুযায়ী মাঝ বরাবর মাটি উঁচু করে একটি সাক্ষী রাখার নিয়ম থাকায় ঐ টিলার জন্ম হয়েছিল। পরবর্তীতে সেখানে আরো মাটি ভরাট করে ৮ কোনা বিশিষ্ট দ্বিতল ভবন স্থাপন করার পাশাপাশি চারদিকে চারটি ঝুলন্ত সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর সাথে স্ব-পরিবারে আব্দুর রব সেরনিয়াবাত নিহত হওয়ায় সকল পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। ১৯৯৭ সালে রব সেরনিয়াবাতের পুত্র তত্কালীন চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ দুর্গাসাগরের সংস্কার করে সীমানা প্রাচীর ও একটি গেট নির্মাণ করেন। এর পরে বরিশাল জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দিঘীর সৌন্দর্য বর্ধন এবং পুকেরে বিভিন্ন প্রজাতির বিপুল মাছের পনা অবমুক্ত করা হয়।

স্থানীয়রা জানান, প্রতিটি সরকারের আমলে দুর্গা সাগরের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার জন্য দেয়া হয় প্রতিশ্রুতি। দক্ষিণ অঞ্চলবাসীর একমাত্র বিনোদন কেন্দ্র হিসাবে দুর্গা সাগরটিকে পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করে পুরনো সুনাম, ঐতিহ্য ও প্রকৃতির রূপ ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট মহলের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহন করা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন এলাকাবাসী সহ গোটা বরিশালবাসী। একটি সূত্র নিশ্চিত করছে দুর্গা সাগরের বর্তমান কেয়ার টেকারের যোগসাজসে অনেকে ভিতরে প্রবেশ করে কাটছে সাগর পাড়ের গাছ, উজার করছে বন। সাগরপাড়ের বন্য পরিবেশ হারিয়ে যাওয়ার কারনে আসছে না দূর-দূরান্ত থেকে অতিথি পাখি। এ ব্যাপারে বরিশাল পরিবেশ আইনবীদ (বেলা)’র সমন্বয়ক লিংকন বাইন এর সাথে আলাপ করলে তিনি জানান, অতিথি পাখী আসলে শীত অঞ্চল গুলোতে থাকতে পছন্দ করে। বরিশালে বিগত বছর গুলোতে শীতের শুরুত্বেই দূর্গা সাগরে আসত অতিথি পাখিগুলো। এবছর এখনো তেমন একটা শীত শুরু হয়নি। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, কাঠ বা জৈব্য জ্বালানী, বন উজার, নদীর পানি দূষন ও পৃথিবীর লেয়ারের উপরে কার্বন পুরো হয়ে যাওয়ায় এই ঋতুর পরিবর্তনই দায়ী। পরিবেশের ভারসম্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীব বৌচিত্র কে বাচিয়ে রাখতে সমাজের প্রতিটি মানুষ কে আরো সচেতন হওয়া প্রয়োজন। তবে পরিবেশ রক্ষায় পরিবেশ আইন আরো কঠোর ও আইনের সঠিক বাস্তবায়ন হলেই এদেশ কে আরো সুন্দর করে গড়ে তোলা সম্ভব। বরিশালের দূর্গা সাগর পাড়ের কেয়ার টেকারের সাথে আলাপ করলে তিনি বলেন, প্রতি বছর সাগর পাড়ের ছোট বড় গাছ ছাটাই করে পরিস্কার পরিছন্ন করে রাখা হয়। পাশাপাশি সগরের মধ্যের টিলাটির ঝোপঝারও পরিস্কার পরিছন্ন করে রাখতে হয় জেলা প্রশাসকের নির্দেশে। তবে খুব বড় বড় গাছ গুলো কাটা হয় না। অতিথি পাখি আসার পরিবেশ রয়েছে এখন কাউকে এখানে এয়ারর্গান নিয়ে প্রবেশ করতে দেয়া হয় না।এ বিষয়ে বরিশাল বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করলে তারা পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয়ের কথাটি এরিয়ে যায়। আর এই রকম প্রাকৃতিক বিপর্যায়ের কথা এরিয়ে যাওয়া বা অস্বীকার করার ফলেই হয়তো বাবুগঞ্জের এই ঐতিহ্যবাহী দূর্গা সাগর হারিয়ে ফেলবে তার পুরানো ঐতিহ্য। আর শতবর্ষী এই দুর্গাসাগরের পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা এবং রক্ষনাবেক্ষন করার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সুদৃষ্টি কামনা করছে এলাকাবাসী তথা পুরো দক্ষিণাঞ্চলবাসী

Leave a Reply