সর্বশেষ সংবাদ
আজ বরিশাল হানাদার মুক্ত দিবস

আজ বরিশাল হানাদার মুক্ত দিবস

 

সাঈদ বারী ॥ আজ ৮ ডিসেম্বর বৃহত্তর বরিশাল হানাদার মুক্ত দিবস।১৯৭১ সালের আজকের এই দেিন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীরা তাদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে কারফিউ ঘোষনা করে লঞ্চ যোগে বরিশাল নগরী ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। এরই সাথে সাথে মুক্তিযোদ্ধারা এবং পুরো বরিশাল বাসী জয়বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগানে উল্লাসে মেতে উঠে। সেদিন জয়বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগানে বরিশালের আকাশ বাতাস মুখোরিত ছিল। পুরো বরিশাল বাসীর মুখে ছিল বিজয়ের আনন্দ ভরা হাসি। উল্লেখ্য ১৯৭১ সালের ২৫ শে এপ্রিল পর্যন্ত বরিশাল শক্রু মুক্ত ছিল। তবে ১৭ ই এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনী আকাশ পথে প্রথম দফা বরিশাল ও পটুয়াখালীতে হামলা চালায়। পরবর্তীতে ২৭ শে এপ্রিল ২য় দফা জল, স্থল ও আকাশ পথে হামলা চালায় তবে বরিশাল শক্র কবলিত হওয়ার আগেই ২৫শে মার্চ রাতেই ঢাকায় হামলা চালানোর পরে ২৬ শে মার্চ বরিশাল সরকারী উচ্চ বাালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (সদর গালর্স স্কুলে) স্বাধীন বাংলা সরকারের অস্থায়ী সচিবালয় গঠন করা হয়। আর এখান থেকেই নবম সেক্টরে যুদ্ধ পরিচালিত হত। এসচিবালয় থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র ও অর্থ সরহরাহ করা হত। আর দেশের দক্ষিন অঞ্চলের যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল এখান থেকেই । একই সাথে এ অস্থায়ী সচিবালয় থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের সুসংগঠিত করে ভারতে প্রশিক্ষনের উদ্দেশ্যে পাঠানো হত। পাক বাহিনী ২৫ শে এপ্রিল বরিশালে নদী পথে প্রবেশ করে। ঐদিন আনুমানিক ১১ টায় সদর ্উপজেলার চরবাড়িয়ায় হামলা চালিয়ে প্রায় ১২৮ জন নিরিহ মানুষকে হত্যা করে তাদের ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দেয় । এরপরে পাকসেনারা নগরীর ওয়াপদা কলোনীতে ক্যাম্প স্থাপন করে সেখান থেকেই তারা বরিশাল বাসীদের উপর হত্যযজ্ঞ চালাত। ওয়াপদা কলোনীতে নির্যাতন শেষে হত্যাপর পরে ক্যাম্প সংগল্গ কীর্তনখোলা নদীদে লাশ ফেলে দিতো বলে জানা যায়। ২৫ এপ্রিল থেকে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২৫ দিন ঐ একই ভাবে নগরবাসীর উপর তারা হত্যাযজ্ঞ চালাতো। আর ঐ ভয়াবহ ২২৫ দিনে হাজারো নারী-পুরুষ পাক বাহিনীর হাতে হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়। এপ্রিল থেকে বরিশাল মুক্ত হওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীরা বানারীপাড়া, কলসকাঠী, বাকেরগঞ্জ, চরবাড়িয়া, স্বরুপকাঠী, তালতলী , মূলাদী ও হিজলা সহ বিভিন্ন স্থানে গনহত্যা ও নির্যাতন চালায়। আর নিরপরাদ বরিশাল বাসীদের হত্যার পরে তাদের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছিল। নারীদের শারিরীক নির্যাতনের পরে হানাদার বাহিনী তাদের ক্যাম্পে হত্যার পরে তাদের কীর্তনখোলা নদীতে ফেলে দিত। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ৭ ই মার্চের ভাষনের পরে বরিশাল সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। আর ঐ সংগ্রাম পরিষদের মাধ্যমে নগরীর প্রতিটি মহল্লায় সামরিক প্রস্তুতি নেয়া হয়। বরিশাল পুলিশ লাইন থেকে প্রায় ৫০০ অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে তৎকালীন বেলস পার্কে (বঙ্গবন্ধু উদ্যান) সংগ্রাম পরিষদের মেজর জলিলের নেতৃত্বে নগরীর প্রধান ট্রেনিং ক্যম্পা চালু হয় আর সেখান থেকেই মুলত বরিশাল বাসীর প্রতিরোধ শুরু হয়। ১৮ এপ্রিল হানাদার বাহিনী পোর্ট রোড, স্টীমার ঘাট , মেডিকেল সংলগ্ন এলাকা, বেলস পার্ক, ওয়াপদা কলোনীতে বিমান হামলা চালায়। পরে ২৫ শে এপ্রিল সড়ক পথে পাক বাহিনী গৌড়নদীর কটকস্থল নামক ব্রীজে ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। আর সেই সম্মুখ যুদ্ধে অল্প সংখ্যক সৈন্য ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হানাদার বাহিনীদের রুখতে পারেনি। সেই যুদ্ধে আল বকস, পরিমল, সৈয়দ হাসেম আলী , মোক্তার আলী সহ অনেকে শহীদ হন। আর একই দিনে পাকিস্তানীদের জলপথে প্রবেশের প্রতিরোধ করতে গিয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র যুদ্ধ জাহাজ ইরানী ও মাজবি পাকিস্তানী গানবোটের কামানের গোলায় ডুবে যায়। পরবর্তীতে পাকিস্তানীদের প্রতিরোধে ব্যার্থ হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা শহর ছেড়ে পাশ্ববর্তী গ্রামগুলোতে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ৬ সেপ্টেম্বর মেজর এম এ জলিলের নির্দেশে উজিরপুরের বারাকোঠার দারোগা বাড়ির প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নবম সেক্টরের দপ্তর স্থাপন করেন ক্যাপ্টেন শাহ জাহান ওমরকে সাব সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব দেন। পাক সেনাদের আক্রমনের প্রথম দিনে মুক্তি বাহিনীরা পিছু হটলেও আগষ্টের মাঝামাঝিতে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানীদের উপরে একের পর এক হামালা চালায়। নভেম্ভরে পাক বাহিনীরা পরাজয় নিশ্চিত জানার পড়ে , ৩রা ডিসেম্বর ভারতীয় বিমান বাহিনী হামলা চালালে তারা শক্তি সামর্থের দিক থেকে ভেঙ্গে পড়ে।৮ ডিসেম্বর বরিশাল ডিসি অফিসে বরিশাল পাক বাহিনীর প্রধান ও তাদের দোসরদের নিয়ে দীর্ঘ রুদ্ধদার বৈঠক করে । বৈঠকের পরে সকাল ১১ টায় শহরে কারফিউ জারি করে গোপনে লঞ্চযোগে বরিশাল ত্যাগ করে। পরে ভারতীয় বিমান বাহিনী পাকবাহিনীদের বহনকারী লঞ্চে বিমান হামলা চালিয়ে লঞ্চটি ডুবিয়ে দেয়। তবে ঐদিন বরিশাল শহর মুক্ত হলেও পাক বাহিনীর প্রধান কার্যালয় মুক্ত হয়নি। বিজয় দিবসের একদিন পরে ১৭ ডিসেম্বর পাক বাহিনী আনুষ্ঠানিক ভাবে নুরুল ইসলাম মঞ্জুর নিকট আত্মসমর্পন করে। আর এই বরিশাল মুক্ত দিবস উপলক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সহ বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচী গ্রহন করেছে। এ দিনটিকে স্মরনে রেখে মুক্তিযুদ্ধা সংসদের পক্ষ থেকে সকাল সাড়ে ৯ টায় বরিশাল সরকারী বলিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পতাকা উত্তোলন করা হবে। পতাকাকে অভিবাদন জানানোর শেষে মুক্তিযোদ্ধাগন র‌্যালী সহকারে মুক্তিযোদ্ধ সংসদ ভবনে চলে আসবেন। সকাল সাড়ে ১০ টায় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ভবনে, সেদিনের প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলির স্মৃতিচারন করে আলোচনা সভা অনুুষ্ঠিত হবে।আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন, বরিশালের জেলা প্রশাসক। এছাড়াও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে বরিশালের মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ন সাহসী অধ্যায়কে স্মরনে রেখে বীর মুক্তিযোদ্ধা সহ নতুন প্রজন্মের কাছে আহবান জানানো হয়েছে।

 

Leave a Reply