সর্বশেষ সংবাদ

আমাদের কবি জীবনানন্দ-মোঃ শহিদুল আলম

মোঃ শহিদুল আলম,জেলা প্রশাসকঃ

আমাদের কবি জীবনানন্দ

(জীবনানন্দ দাশের জন্ম বর্ষিকী উপলক্ষে শ্রদ্ধাজ্ঞলি)

সত্যানন্দ দাশের ঘরে সত্য সাধক, প্রকৃতি সাধক চিত্ররূপময় এক সন্তান জন্মেছিলেন বসন্তের মিষ্টি সকালে। ১৭

ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯ সালের সে সকালে কবি কুসুম কুমারী দাসের হয়তো মনে ছিল সুসন্তানের জন্য তীব্র আকুতি। তাই কুসুম কুমারী দাস জীবনানন্দ দাশের জন্মের পূর্বেই ১৮৯৫ সালে  লিখেছিলেন আদর্শ ছেলে কবিতাটি। ঐ কবিতার প্রথম দুই লাইনে কবি মাতা বাংলার অন্যতম কবি, বরিশাল জেলার গৈলা নিবাসে জন্ম নেয়া কবি কুসুম কুমারী দাস লিখেছিলেন-

“আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে

কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে ?”

একশত বিশ বছর আগে ১৮৯৫ সালে ‘মুকুল’ নামক শিশু পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও কবিতাটি আজো আধুনিক এবং একান্ত আগ্রহের দর্শন হিসেবে উচ্চারিত হয়। সমগ্র দেশে সহস্র, অযুত কিংবা লক্ষ লক্ষ আদর্শ ছেলে মেয়ে কবি প্রার্থনা করে কতটুকু পেয়েছিলেন সেটি বিচার-বিশ্লেষণের দাবী রাখে। তবে মায়ের প্রার্থনা পূরণে যে তার পুত্র জীবনানন্দ দাশ সক্ষম হয়েছিলেন সেটা আমরা জীবনানন্দ দাশের সৃজন হতে উপলব্ধি করতে পারি। কবি জীবনানন্দ দাশকে বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন ‘নির্জনতম কবি’। জীবনানন্দ দাশ মানুষ হিসেবেও যেমনই হোক না কেন আজ যখন সন্ধ্যা নামে, যখন সোনালী ডানার চিলেরা উড়ে উড়ে ঘুরপাক খায়, যখন খোলা বারান্দায় খয়েরি শালিকেরা জটলা করে তখন আমি জীবনানন্দ দাশকে খুঁজি, কবিকে খুঁজি।

 

ভোরের শিশিরে, কাঁঠাল ছায়ায়, ধাঁনসিড়ি জলের ঢেউ এ ঢেউ এ আমি কবিকে খুঁজে পাই। কবি মাতা কবি কুসুম কুমারী দাস তাই একজন স্বার্থক মাতা। তিনি যে আদর্শ ছেলে চেয়েছিলেন সে ছেলের অন্ততঃ একজন তিনি জন্মদান, দুগ্ধদান, অক্ষরদান এবং প্রকৃতি প্রেম, দেশপ্রেম দিয়ে অনন্য রূপে পৃথিবীকে উপহার দিতে পেরেছিলেন।

 

২২ অক্টোবর নির্জনতম কবির মৃত্যু বার্ষিকী। ১৯৫৪ সালে তিনি দেহ ত্যাগ করেছেন। কিন্তু তবু তিনি আছেন। কারণ, তিনি লিখেছিলেন-

” আবার আসিব ফিরে ধান সিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়

হয়তো মানুষ নয়-হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে।”

 

জীবনানন্দ দাশ বেঁচে নেই একথা আমি ভাবতে পারিনে। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের রবি। সে রবিতে কোনদিন ‘গ্রহণ’ লাগেনি। তিনি জাজ্বল্যমান, উত্তাপদায়ী হয়ে রয়ে যাবেন চিরকাল। একইভাবে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এক সাহসী অগ্নিশিখা হয়ে, বিদ্রোহে-বিপ্লবে সাহিত্য সেনাপতি হয়ে আছেন এবং থাকবেন। কিন্তু তাদের পাশে বাংলাদেশের জলহাওয়ায় জন্ম নেয়া শতভাগ পূর্ব বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ পুরোপুরি আমাদের কবি, জ্ঞাতি কবি। তিনি বাংলার রূপ অতি গভীরভাবে দেখেছিলেন। সেজন্য তিনি বুঝি বাংলার মৌলিক কবি সে কারণেই তিনি আপন অনুভবে লিখতে পারেন-

“বাংলার রূপ আমি দেখিয়াছি,

তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর।”

বাংলার মাটিকে ভাল না বাস্‌লে এমন করে উচ্চারণ করা যায়না, এমন গভীরভাবে দেশপ্রেমকে কাব্যে প্রকাশ করা যায়না।

 

আজ যখন বিখ্যাত অনেকের দেশপ্রেম খাটি কিনা তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয় তখন আমরা জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়ে দেশত্মবোধে উদ্বুদ্ধ হতে পারি। কারণ তিনি আবেগ নিয়ে বলেছিলেন-                                                                 ”তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও-

আমি এই বাংলার পারে রয়ে যাব;

দেখিব কাঁঠাল পাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে।”

দেশপ্রেম ছাড়া একটা মানুষ যেমন নকল মানুষ। ঠিক সেভাবে কবিও কবিতা ছাড়া জীবনের সর্বাঙ্গ থাকে বিরস ও মরুময়তায় ঢাকা, থাকে বিবর্ণ-ধূসর।

 

জীবনানন্দ দাশ এর বিনয় আমাকে খুব করে কাছে টানে। তিনি আকাশলীনা কবিতায় লিখেছেন,

” সুরঞ্জনা, অইখানে যেয়ো না কো তুমি;

বোলোনাকো কথা অই যুবকের সাথে;

ফিরে এসো সুরঞ্জনা;

নক্ষত্রের রূপালি আগুন ভরা রাতে।”

প্রেমের জন্য ভালবাসার জন্য এমন আকুতি আর কোন কবির মধ্যে আমরা দেখিনা। প্রকৃত প্রেমিক যেমন কখনো আঘাত করেনা, জবরদস্তি করেনা এ যেন তেমনি এক পেলব কোমল আহ্বান। এ আহ্বান আছে বলেই আমরা হয়তো সুখে আছি, হয়তো সুখে থাকবো আমাদের ভালবাসা ভরা বনলতাদের কোলঘেষে তাদের ঘরে।

 

জীবনানন্দ দাশ পুরুষের আবেগ মথিত আহ্বান যেমন আকাশলীনায় ব্যক্ত করেছেন তার চেয়ে অনেক বেশী বড় করে নারীকে প্রকাশ করেছেন, “বনলতাসেন” কবিতায়। বনলতাকে তিনি রূপ, স্নেহ এবং আশ্রয়ের প্রতীক করে তুলেছেন বাংলা কাব্য সম্ভারে। বনলতা সেনকে অনুসরণ করে  আজও কোটি-কোটি নারী হৃদয় হয়ে উঠ্‌তে পারে মোহনীয়, কমনীয় ও ভালবাসা পূর্ণ একান্ত আশ্রয়। যে আশ্রয়ে হালভাঙা নাবিক ফিরে পাবে দিশা, বিশ্ব পর্যটক পাবে একদন্ড শান্তি আর বাকী পৃথিবীর সকল মানুষ পাবে লেনদেনহীন স্বর্গীয় প্রশ্রয়। সমগ্র বাংলা সাহিত্যে “বনলতা সেন” এর মত অনুপ্রাস সমৃদ্ধ, স্বল্প কথায় বহুভাব ব্যক্তকারী কবিতা আর বুঝি একটাও নেই। বনলতা সেন কবিতার মধ্যভাগে কবি বলেছেন-

“চুলতার কবে কার অন্ধকার বিদিশার নিশা,

মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য;

অতি দূর সমুদ্রের পর হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা

সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি দ্বীপের ভিতর,

তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে,

এতদিন কোথায় ছিলেন ?

পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।

আমরা সকলেই চাই, এমন করে আমাদেরকে কেউ বলুক এতদিন কোথায় ছিলেন ? এ যে অপেক্ষা ও প্রাপ্তি অনন্য মিলন। বনলতা তাই আমাদের অন্ধকারের আলো। জোনাকীর আলোর চেয়ে নরম-কমনীয় এক আলো। অথচ সে আলো উদ্ভাসিত হয়ে সমস্ত হৃদয় পরিপূর্ণ করে ভরে দেয় মন-প্রাণ। একই সংগে দুঃখ-ব্যাথা মিলিয়ে দিয়ে বনলতা সেন বলতে চায়- ‘যখন কেউ থাকবেনা, তখনো পাবে তুমি আমাকে। অন্ধকারে আমাকে পাবে। কবিতায় আমাকে পাবে। হাজার বছর ধরে পথ হেটে যখন তুমি ক্লান্ত হবে, যখন জীবন তোমার ধূসর মনে হবে, তখন তোমার ক্লান্ত প্রাণে সমুদ্রের হিম-হাওয়া নিয়ে তোমাকে আমি শান্তি দেব। জীবনানন্দ দাশ তাই বহু ভাঙ্গা প্রাণ জোড়া দেয়া কবি, রোমান্টিক কবি, গভীর মমতা মিশ্রিত আধুনিক কবি।

 

তিনি সমাজের জন্যও এক পথিকৃৎ দার্শনিক। বুকে অনেক ব্যাথা নিয়ে কবি “অদ্ভুত আধার এক” কবিতায় লিখেছেন,

” অদ্ভূত আধার এক এসেছে পৃথিবীতে আজ

যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;

যাদের হৃদয়ে কোন প্রেম নেই-প্রীতি নেই-করূণার আলোড়ন নেই,

পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।”

কবির জোরালো প্রতিবাদী ঐক্য প্রকাশে বোঝা যায় প্রেমহীন শাসনে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ক্লান্ত। হয়ে পড়েছিলেন ক্লান্ত প্রাণ মৌমাছি। হয়ে পড়েছিলেন ভালবাসার একান্ত কাঙ্গাল, বুভুক্ষ প্রাণ।

 

কবি জীবনানন্দ দাশ ১৯২২ সাল হতে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করেন। ১৯২২ -১৯২৮ সালে পর্যন্ত তিনি কলকাতা সিটি কলেজ, ১৯২৯ সালে বাগেরহাট কলেজ, ১৯৩০-১৯৩১ সাল পর্যন্ত তিনি দিল্লী রামযশ কলেজ, ১৯৩৫-১৯৪৬ সাল পর্যন্ত বরিশাল বি.এম. কলেজ, ১৯৫১-১৯৫২ সাল পর্যন্ত খড়গপুর কলেজ, ১৯৫৩ সালে বরিশাল কলেজ এবং জীবনের অপরাহ্নে হাওড়া গার্লস কলেজে ১৯৫৩-১৯৫৪ পর্যন্ত অধ্যাপনা করেন। তাঁর কর্মজীবন বিশ্লেষণে দেখা যায় অস্থির এক টানা পোড়েন। মাঝে-মাঝে কর্মহীন থাকা আবার স্বল্প সময়ে পুনঃচাকুরী খুঁজাখুঁজি করা কম ধকলের বিষয় ছিলনা। তবু তিনি সৃজনশীলতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাবমুক্ত আধুনিক বাংলা কবিতা ধারা সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন।  “ধূসর পান্ডুলিপি” পাঠান্তে তাই বিশ্ব কবি এক পত্রে লিখেছিলেন, ” তোমার কবিতাগুলো পড়ে খুশি হয়েছি। তোমার লেখায় রস আছে, স্বকীয়তা আছে এবং তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে।” সত্যি তাই, জীবনানন্দ দাশের কবিতায় রস ও আনন্দ আছে। সে কারণেই জীবনানন্দ দাশকে বিশ্ব কবি “চিত্ররূপময়” উপাধি দিয়েছিলেন।

 

আজ ব্যাথা ভরা ভাবনার বিষয় হচ্ছে, যে কবি প্রকৃতিকে ভালবাসতে শেখালেন, যে কবি ঝরা পালক (১৯২৭), ধূসর পান্ডুলিপি (১৯৩৬), বনলতা সেন (১৯৪২), মহাপৃথিবী (১৯৪৪), সাতটি তারার তিমির (১৯৪৮) উপহার দিলেন একের পর এক, তিনি কেন নির্জনতাকে গ্রহণ করলেন? কিসের অভিমানে তিনি মাত্র ৫৫ বছরে চলে গেলেন অনেক দূরে ? কেন তিনি ‘মাল্যবান’ হতে গেলেন ? কেন তিনি বিদ্রোহী কবির মত করে  ” আমি ছিনিয়া আনিব বিষ্ণু বক্ষ হইতে যুগলকন্যা” আদর্শ ধারণ করে ‘উৎপলা’কে আপন বাহুডোরে জড়িয়ে রাখতে পারলেন না ? যদি লাবন্য দেবী কিছুটা বন্যও হয়ে থাকেন তবু তাকে কবিতার মত কোমল করে গড়ে তুলতে নিজ দায়িত্বে কেন জীবনানন্দ দাশ ব্যর্থ হলেন ? বিষয়টি  আমাদেরকে ভাবিত করে, বিচলিত করে।

 

কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের মর্ত্যের ঠিকানায় স্বর্গের পাখি। তিনি ১৮৯৯ সালে জন্মেছিলেন। একই সালে জীবনানন্দ দাশও জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাই বাঙালি হিসেবে ১৮৯৯ সালের কাছে আমরা ঋণী। আর বরিশালের প্রাচীন পন্ডিত জনপদ ‘ফুল্লশ্রী’ যা এখন আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা গ্রাম। সে গ্রামের কাছেও আমরা বাঁধা পড়ে আছি কবি মাতা কুসুম কুমারী দাস এর জন্মভূমি-পিত্রালয় বলে এবং মধ্যযুগের অনন্য কবি বিজয়গুপ্তের কাব্য চর্চার কারণে। কবি বিজয়গুপ্ত মনসা মঙ্গল কাব্য রচনা করেছিলেন ১৪৮৪-১৪৯৩ সালের মধ্যে গৈলাস্থ মনসা মন্দিরের পাশে বসে। তখনও আমাদের আদর্শলিপি প্রকৃত আদল পায়নি। গৈলার পান্ডিত্য-কাব্য তাই যেন জীবনানন্দ দাশের মননে ও সৃজনে আমরা জড়িয়ে থাকতে দেখি।

 

জীবননান্দ দাশের মৃত্যু বার্ষিকীতে তাই তার স্মৃতিধন্য প্রতিটি জমিন যেমন পবিত্র হয়ে ধরা দেয়, ঠিক সেভাবে ঘাস-লতা, গাছ-পাতা, বক, শঙ্খচিল একান্তভাবে কাছে এসে বলে- মনে রেখো সৃষ্টিশীল মানুষের মৃত্যু নেই, কবিরা মরেনা। তারা সবুজ পাতায় যেমন বেঁচে থাকে, তেমনি বেঁচে থাকে ঝরা পালকে, ঝরা পাতায়। জীবনের রঙ যখন পূর্ণাভা পায় তখনো থাকেন কবি, আবার যখন শেষ হয় জীবনের সব লেনদেন তখনো জেগে থাকেন কবি। জাগরুক থাকেন, অম্লান থাকেন জীবনানন্দ দাশ। কারণ তিনিই তো বলতে পারেন,

 

“শেষ হল জীবনের সব লেনদেন,

বনলতা সেন।

কোথায় গিয়েছো তুমি আজ এই বেলা

মাছরাঙা ভোলেনি তো দুপুরের খেলা

শালিখ করে না তার নীড় অবহেলা।

উচ্ছ্বাসে নদীর ঢেউ হয়েছে সফেন

তুমি নাই বনলতা সেন।”

হে কবি, হে প্রকৃতির বিশুদ্ধতম কবি, তুমি নেই বলে আজ ধূসর লাগে বিশ্ব প্রকৃতি। তুমি নেই বলে প্রেমে ভেজাল ঢুকেছে, যান্ত্রিক হয়ে উঠ্‌ছে জীবন। তুমি নেই বলে ঘাস ফড়িং লক্ষ্ণী পেচা, ঘাই হরিণ কেঁদে-কেঁদে তোমাকে খোঁজে। কারণ তোমার মত করে কেউতো কোন দিন তাদেরকে ভালোবাসেনি। তোমাকে তাই তোমার মত করেই আহ্বান করি-ফিরে এসো, ফিরে এসো-

“ফিরে এসো এই মাঠে,

ঢেউয়ে;

ফিরে এসো হৃদয়ে আমার।”

DC SIR

মোঃ শহিদুল আলম, জেলা প্রশাসক, বরিশাল

লেখক:

মো. শহীদুল আলম

কবি ও প্রাবন্ধিক

 জেলা প্রশাসক, বরিশাল

সংগৃহীত

Leave a Reply