সর্বশেষ সংবাদ

নাম ভূমিকায় আরজ আলী মাতুব্বর-মোঃ শহীদুল আলম

হে অগ্রজ বন্ধু, তুমি সৃষ্টি-দানে অমর রহো, অম্লান রহো

     সূর্য তেজে জ্বলে ওঠো অন্ধকার সকল খানে

মোঃ শহীদুল আলম, জেলা প্রশাসক, বরিশাল।

নাম ভূমিকায় আরজ আলী মাতুব্বরঃ সৃষ্টির রহস্য সন্ধানে যিনি বহু প্রশ্ন উল্থাপন করে সত্য সন্ধান করতে চেয়েছেন, যিনি প্রচলিত ভাবনায় ঝড় তুলতে সক্ষম হয়েছেন তিনিই মহান শ্রষ্টার ইচ্ছায় পেয়েছেন এক ছন্দময় নাম। আরজ শব্দের মধ্যে যেমন বিনয় বিদ্যমান তেমনি আলী শব্দের মধ্যে শক্তি ও সক্ষমতা নিহিত। পাশাপাশি মাতুব্বর শব্দের মধ্যে বিচারিক বোধ সম্পন্ন এক নেতৃত্ব ভূমিকা প্রকাশিত। সব মিলিয়ে আরজ আলী মাতুব্বর নামের মধ্যে একটা ছন্দময়তা বিদ্যমান। তিনি যে সাধারণের মধ্যে অসাধারণ, তিনি যে হার না মানা এক দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞা সম্পন্ন বিশেষ ব্যক্তিত্ব এটি তার নামেই প্রকাশ পায়। আরজ আলী মাতুব্বর নামের মধ্যে আজ এমন একটি আভা-প্রভা ও তেজ উদ্দীপ্ত যা আলোকিত করে অন্ধকারকে এবং গতিময় করে জড়তাপূর্ণ বহু স্থবির নারী-পুরুষকে। আবার তাঁর সমগ্র জীবনের জিজ্ঞাসাকে তিনি যেন জানার একান্ত প্রার্থনা, একান্ত আবেগে, একান্ত অনুসন্ধিৎসা নিয়ে প্রস্ফুটিত করেছেন ‘আরজ’ শব্দের নাম ভূমিকায়। আরজ আলী মাতুব্বর তাই শুধু কর্মে ও সৃষ্টিতে নয়, নামেও ইতিহাস।

 

পিতৃহারা আরজ আলী-সম্পত্তিহারা আরজ আলীঃ মাত্র চার বছর বয়সে পিতৃহারা হন দার্শনিক আরজ আলী। ১৩০৭ সালের ০৩ রা পৌষ বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়ীয়া ইউনিয়নের লামচরি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা এন্তাজ আলী মাতুব্বরের মৃত্যুতে মাতা রবেজান বিবি তাকে কষ্টে, অতিকষ্টে প্রতিপালন করেন। পিতার রেখে যাওয়া জমি ‘লাখুটিয়া জমিদারগণ’ খাজনা অনাদায়ে নীলামে তোলেন ও গ্রাস করেন। কৃষক বালক এরুপে ভূমিহীন কৃষি শ্রমিকে পরিণত হন। এরপর চড়াসুদের ঋণের দায়ে বরিশালের ‘জনার্দন সেন’ বাড়ী নীলামে তোলেন এবং আত্মস্থ করেন। ফলে গৃহহীন আরজ আলীর জীবনে তখন শুধু আকাশ দেখা, প্রকৃতি দেখা ছাড়া দেখভাল করার মত কিছুই থাকেনা। প্রকৃতপক্ষে দার্শনিকের জীবনে সম্পদ ও সম্মান কোনটিই শিশুকালে জোটেনি। মা ঝি এর কাজ করতেন; সে কারণে এখন থেকে শত বর্ষ আগে দরিদ্র পরিবারের জীবন কতখানি অবহেলিত হতে পারে আজো ভাবনার বিষয় বটে। কারণ ঝি এর ছেলে-মেয়েদের সম্মান আধুনিক শিক্ষিত সমাজেও ছিটে-ফোঁটা মাত্র নেই। অসহায় শিশু আরজ আলীর আরজ তাই সেদিন কেউ যে গুরুত্ব দেয়নি এটা সহজেই বোঝা যায়।

 

আদর্শলিপি দিয়ে জ্ঞান যাত্রাঃ বাংলা ১৩২০ সালে তিনি আদর্শলিপি পড়ার সুযোগ পান। তার বয়স তখন ১৩ বছর। দুরন্ত কিশোর সে সময়ে আত্ম-আনন্দে ও মনোবাঞ্চা নিয়ে বিভোর না হয়ে বিভোর থাকতেন অজানাকে জানার অদম্য স্পৃহায়। জীবন বাণী অংশে তিনি লিখেছেন,

“আশৈশব প্রবল ছিল আমার অজানাকে জানার স্পৃহা। বিশেষত প্রকৃতি সম্বন্ধে। মুন্সি সাহেবকে সময় সময় প্রশ্ন করতাম দিন-রাত, জোয়ার-ভাটা, শীত-গ্রীষ্ম হয় কেন ইত্যাদি। উত্তর যাহা পাইতাম মনোপূত হইতনা। অথচ নিজেও সমাধান করিতে পারিতাম না বলিয়া অশান্তি বোধ করিতাম।”

মহান দার্শনিকের এই জীবনবোধ জ্ঞান অর্জনের জন্য তীব্র সাহস ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। এছাড়া সম্পত্তিহীনতা যে কোন বড় বাধা নয় এমনি এক আদর্শ ও উজ্জ্বল হয়।

 

এক্ষেত্রে জানার জন্য, জ্ঞানের জন্য আগ্রহ এবং মনের ভিতরে প্রশ্ন তৈরি করতে পারাটা খুবই জরুরী। যিনি জানতে চান তিনি সাধনা দিয়ে অধ্যাবসায়, দিয়ে জানতে পারেন এবং পরিণত জীবনে অনেকের কাছে জানাতে পারেন তার অর্জন ও আবিস্কারকে, সেটাই প্রমাণ করেছেন পিতৃহীন এবং সম্পত্তিহীন খেটে খাওয়া ব্যক্তিত্ব আরজ আলী মাতুব্বর। এক্ষেত্রে জাতীয় কবির কাব্য লাইন-

“হে দারিদ্র তুমি মোরে করেছ মহান,          তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিস্ট্রের সম্মান

কন্টক-মুকুট শোভা দিয়াছ তাপস,            অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস ”

 

বেশ লাগসই বলেই মনে হয়। যদিও দারিদ্র বেশীর ক্ষেত্রে অপমানকেই উস্‌কে দেয় এবং বহু জীবনকে বিশ্রীভাবে ব্যর্থ করে দেয়।

 

মঙ্গলবাণীর কবি আরজ আলী মাতুব্বরঃ জাতীয় কবির জন্ম ১৮৯৯ খৃষ্টাব্দে আর আরজ আলী মাতুব্বরের জন্ম ১৯০০ খৃষ্টাব্দে। দু’জন সৃষ্টিশীল মহান মানুষের জীবনও কর্ম এমনকি শিশুকালের ইতিহাসও অনেকটা অভিন্ন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কবি, গীতিকার, সুরকার, বাঁশিয়াল ছিলেন। মাতুব্বরও কবি, গীতিকার, সুরকার ও বাঁশিয়াল ছিলেন। তিনি নিজে বাঁশি বানাতেও পারতেন। ‘সীজের ফুল’ নামক কাব্যাংশে কবি আরজ আলী মাতুব্বর লিখেছেন,

“দীপ নিভিয়ে গেলে ফল কি আছে তৈল দানে ?         চোর পালিয়ে গেলে আর কি লাভ আছে সাবধানে ?

চলে গেলে জীবন পাখি বৈদ্য ডেকে হয় কি ফল ?       ফল কি রে বাঁধিলে আলি শুকাইলে ক্ষেতে জল ?

সময়মতো কর্ম কর, রেখ না কখন ফেলিয়া;               কর্ম বিফল হবে গেলে কাজের সময় চলিয়া।

এখানে ছন্দের গাঁথুনি, অর্থ ও উপদেশনা মিলে স্বল্প বাকে আরজ আলী মাতুব্বরের মধ্যে উত্তম কবি প্রতিভা প্রকাশ পেয়েছে। যা আমাদেরকে অভিভুত করে। প্রচলিতভাবে বেশীরভাগ মানুষই তাকে দার্শনিক বলেই জানে। আমিও তাই জানতাম। কিন্তু গভীরে গিয়ে ভুল ভাঙ্গল। অন্য এক কবিতায় তিনি লিখেছেন,

“মুখের শ্রী, চোখের শ্রী বৃথা অহঙ্কার,      সে অধম-রুপবানে, গুন নাহি যার।

শতজন রুপবান, এক গুণবান-                ছ’হাজার তারা যেন এক গোটা চান।”

এখানে তিনি গুণ ও যোগ্যতা কে প্রাধান্য দিয়ে মানবজাতির জীবন ও চলার পথ দেখিয়েছেন। তিনি রুপ মোহ, অহঙ্কার মোহ হতে মুক্তি ঘটাতে খুবই ক্ষুদ্র কবিতায় আদর্শ জীবনবোধ জাগাতে সক্ষম হয়েছেন। তাই তিনি দার্শনিক কবি। তিনি হিত বাণীর কবি। তিনি মঙ্গল কবি।

 

রন্ধন শিল্পী হিসেবে সুখ্যাত মাতুব্বরঃ বিশ্বের বহুবিধ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা নিয়ে যার জীবন আবর্তিত হয়েছে সেই মানুষটি আবার উত্তম বাবুর্চি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। অধ্যাপক মুহম্মদ শামসুল হক, কিছু স্মৃতি, কিছু কথা নামক প্রবন্ধে লিখেছেন,

 

“পিতৃবন্ধু স্থানীয় ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট এবং কাজী সাহেবের হবু শ্বশুরের বড় কন্যার বিয়ে। সন্ধার পর রান্নাবান্নার বিরাট আয়োজন হচ্ছে। রন্ধনশিল্পী আরজ আলী মাতুব্বর। শুনে আমি চমকে উঠলাম। মাতুব্বর সাহেবের সংগে বিশ বছরের সম্পর্ক। কোনদিন আমার বাসার মাছ-মাংস খাননি। আমি অবাক হওয়াতে কাজী সাহেব এই বলে আশ্বস্ত করলেন যে, বিটোফেন কানে শুনতেন না, তবু পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুরশ্রষ্টারদের মধ্যে অনন্য। মাতুব্বর সাহেব মশলাপাতি হাতের আন্দাজ এমনভাবে দিতেন যে, ব্যঞ্জন অত্যন্ত সুস্বাদু হতো। নিজে না খেলে বুঝবেন না।” অতঃপর তিনি মাতুব্বর হাতের রান্না খেয়ে বলেছিলেন, “এমন তৃপ্তির সংগে অনেকদিন খাইনি।” তিনি বেঁচে থাকলে এ রহস্য উদ্‌ঘাটনের জন্য চেষ্টা করা যেত এবং একদিন তার আতিথ্য গ্রহণের সুযোগ হয়তো আমিও পেতাম। দুঃখটা রয়েই গেল।

 

বহুগুণের ধারক ও সৃজনশীলতার অনন্য এক মানুষঃ মাতুব্বর সাহেবের বই ও জীবনী তথ্য পাঠ করে আমিও অবাক হয়েছি। আর ভেবেছি আমরা যারা দু’একটা কাজ জেনেই অহংকার করি তারা কতইনা ক্ষুদ্র। জীবিকার জন্য মাতুব্বর সাহেব আমিন হিসেবে কাজ করতেন। এ কাজে তাঁর সততা, নিষ্ঠা এবং নিখুঁত মাপ-জোক কিংবদন্তী হয়ে আছে। তাঁর চিহ্নিত সীমানা ও আল আজো কেউ ভুল প্রামাণ করতে পারেননি। আদর্শিক বৈপরিত্য থাকা সত্ত্বেও চরমোনাই পীর সাহেবগণও তার সাহায্যে সম্পত্তি ভাগ-বাটোয়ারা করেন। এ থেকে বোঝা যায় তিনি অমিত্রগণের কাছেও অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ছিলেন। যে কোন রকমের ইঞ্জিন মেশিনের কল-কব্জাগুলো তন্ন-তন্ন করে দেখবার এবং গড়বার ক্ষেত্রে উৎসাহের ঘাটতি ছিল না। তিনি ছুতারের কাজ, তাঁত তৈরি ও বস্ত্র বয়নের কাজ, মাছ ধরার নানা ধরনের জাল বুনার কাজও বেশ ভালো জানতেন।

 

তার কবিতায় যেভাবে আমরা দেখেছি, রুপের চেয়ে গুণের মহিমা নিজ জীবনেও তিনি সেটি প্রতিফলিত করেন। তিনি জ্যামিতি ও বীজগণিত স্বউদ্যোগে শিক্ষালাভ করে বহু ছাত্রের সমস্যা সমাধান করে দিতেন বলেও জানা যায়। তাঁর হাতের লেখা পান্ডুলিপি দেখলে অবাক হওয়ার মত নান্দনিক সৌন্দর্য চোখে পড়ে। শৈল্পিক ছিল তার হস্তাক্ষর। এছাড়া ডাইনামো তৈরি করে ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করে নিজে আনন্দ লাভের পাশা-পাশি তার সুজনি দিয়ে মৃগ্ধ করেছেন বহুজনকে।

 

বহুগুণের এ মানুষটি মিষ্টভাষী ছিলেন এবং শিল্পীমনা ছিলেন। ‘সত্যের সন্ধান’ প্রথম প্রকাশ বাংলা ১৩৮০ এর প্রচ্ছদ আঁকেন লেখক নিজে। তার আঁকা প্রচ্ছদ ভাবনার উপাদানে ভরা। রহস্য ও গবেষণার উপাদান সমৃদ্ধ প্রচ্ছদ আমাকে আপ্লুত করেছে। অনুরোধ রইল প্রচ্ছদটি পাঠকবৃন্দ উৎসাহ নিয়ে খোঁজ করবেন এবং একান্ত অনুভবে দৃষ্টিপাত ও মনোনিবেশ করবেন।

 

অতুলনীয় দানবীর আরজ আলী মাতুব্বরঃ সামান্য পয়সা দানে আমরা কত না খুশি হই। কিছু অর্থ, খাদ্য ও বস্ত্র দান করে আল্লাহ পাকের কাছে সত্তর গুণ বেশি প্রত্যাশা করি। অথচ দরিদ্র লেখক তার জীবদ্দশায় ঘোষণা দিয়ে দান করেছেন। তার দু’টো চোখ এবং সমগ্র দেহ। অপার মহিমা সৃষ্টিকর্তার এ কারণে যে, যিনি শ্রষ্টা প্রসঙ্গে কথা বলায় এবং প্রশ্ন করায় অনেকের নিন্দা ভোগ করেছেন, জেল খেটেছেন, সেই মানুষটিই অন্ধের জন্য দান করে যেতে পারেন চোখ; বিলিয়ে দিতে পারেন নিজের মরদেহ। প্রকৃত ধার্মিক, প্রকৃত মানবতাবাদী ও মানব দরদী না হলে এমন দানের স্পৃহা মনে জেগে উঠারই কথা নয়। মানুষের প্রতি তার ভালবাসা, পৃথিবীতে বিজ্ঞানের জয়যাত্রা দেখার তার প্রত্যাশা হতে তার অপরিসীম দান তাকে অতুলনীয় দানবীর করেছে। তিনি এমন উঁচু হৃদয় কেমন করে লাভ করলেন সেটি আজও যেমন ভাবনার ভবিষ্যতেও ভাবনার কারণ হয়ে থাকবে।

 

আজীবন অনুসন্ধিৎসু অধ্যবসয়ী ছাত্রঃ দার্শনিক সাহেব মৃত্যুবরণ করেন ১৯৮৭ সালে বাংলা ১৩৯২ সনের ০১ লা চৈত্রে। দীর্ঘ ৮৭ বছরের আয়ুষ্কালে তিনি একটানা প্রায় ৭০ বছর পড়াশুনা করেন। ফলে পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ত্যাগী ও ধৈর্যশীল পাঠক ২য় মেলা ভার। লামচরি হতে বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরীর দূরত্ব ১১ কিলোমিটারের কম নয়। রাস্তার সুব্যবস্থা না থাকা স্বত্ত্বেও তিনি পায়ে হেঁটে আসা-যাওয়া ২২ কিলোমিটার পথ জ্ঞানের জন্য পাড়ি দিতেন। এমন সাধক অর্থ দিয়ে, গাড়ী দিয়েও পাওয়া কঠিনতর। আর তার ফল আমরা দেখতে পাই মাতুব্বর সাহেবের লেখনিতে। আজকে তাই দিন যতই যাচ্ছে আরজ আলী মাতুব্বর ততই উজ্জ্বলতর হচ্ছেন; তার প্রজ্ঞা সমাদৃত হচ্ছে। গ্রাম্য টোলঘরের আদর্শলিপি যার বিদ্যে, তিনিই আজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষকের কাছে পাঠ্য ও গবেষণার উপাদান। আজীবনের অধ্যবসয়ী ছাত্র হিসেবে তাই বর্তমান প্রজন্ম তার জীবন থেকে ভাল ছাত্র হয়ে উঠার ব্রত শিখতে পারেন, শিখতে পারেন বড়রাও। যাদের মনে বই এর প্রতি বিতৃষ্ণা জেগেছে, যাদের চোখে ইলেকট্রনিক্স রঙ ধরিয়েছে তাদের কাছেও মাতুব্বর সাহেব অন্বেষণার জন্য শ্রদ্ধার আসনে নেতৃস্থানীয় হয়ে থাকবেন এ বিশ্বাস আমার দৃঢ় ভাবেই আছে।

 

লৌকিক দর্শনের প্রণেতা আরজ আলী মাতুব্বরঃ ভাববাদী দর্শন ও বস্তুবাদী দর্শনের কথা আমরা জানি। কিন্তু লৌকিক দর্শন যে কি বস্তু বা কি তার অনুভব সেটি আরজ আলী মাতুব্বর মহাশয়ের ‘সত্যের সন্ধান’ পাঠে কিঞ্চিত ধারনা হয়েছে। তিনি সাধারণ বা লোক সমাজের প্রচলিত ভাবনা ও বিশ্বাসগুলোকে গবেষণা করে নিজস্ব তাসাউফে এমন একস্তরে নিয়ে গেছেন, যেখানে সহজে উত্তর মেলেনা তার প্রশ্নের। আবার অবান্তর বলে উড়িয়েও দেয়া যায় না। বরং প্রচলিত বিশ্বাস ও কুসংস্কার এমনকি সংস্কারেও টান পড়ে। তিনি ঈশ্বর, পরকাল, ধর্ম, প্রকৃতি এবং সৃষ্টি রহস্যও নিয়ে এমন সব প্রশ্ন ও যুক্তি উল্থাপন করেছেন যা ভাবনাকে গভীরতর করে। বিশ্বের রহস্যসমুহ সম্পর্কে মানব মনকে বিচলিত করে। এক্ষেত্রে পাঠক যতটুকু বিচলিত হন, দার্শনিক আরজ আলী ততোধিক শক্তিশালী হয়ে উঠেন এবং থাকেন। তার কোন লেখায় এতটুকু তমসা কিংবা বিভ্রান্তি চোখে পড়ে না। তিনি তার বস্তুবাদী যুক্তি ও বিশ্বাসে অনড় থেকে হয়ে উঠেন আধুনিক কালের বস্তুবাদী দার্শনিক। তিনি রাজনীতির বাইরে, বিশ্বজয়ের বাইরে সাধারণ ও প্রাকৃত জনগোষ্ঠীর জীবনবোধের মধ্যে নতুন-নতুন জিজ্ঞাসা রেখেই হয়ে উঠেছেন লৌকিক দার্শনিক।

বিনয়ী ও মুক্তবুদ্ধির পৃথক প্রকৃতির মানুষঃ একজন মুক্ত বুদ্ধি চর্চার মানুষ হিসেবে তিনি যথেষ্ঠ বিনয়ীও ছিলেন। তাঁর জীবনী বিভিন্ন বক্তৃতা পাঠান্তে আমরা সেটা জানতে পারি। তিনি কৃষক বলে লজ্জাবোধ করতেন না। আবার সত্য প্রকাশে ভীতও হতেন না। আরজ মঞ্জিল পাঠাগারের ৬ষ্ঠ বার্ষিক অনুষ্ঠানে ০৩-০৯-১৩৯২ সালের বক্তৃতায় তিনি বলেন,

 

“কৃষিকাজে জীবন কাটিয়েছি। তাই কৃষকেরা আমার বন্ধু। কিন্তু গম, গোলআলু ও ধান চাষীরা আমার বন্ধু বটে, গাঁজার চাষীরা নয়”

 

তাঁর এই নিষ্কলুষ মনোভোব চিরকালের স্বাত্মিক সমাজের জন্য আদর্শ। ১১-০১-১৯৮৫ সালের বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় মাতুব্বর সাহেব বলেন,

“পরম পরিতাপের বিষয় এই যে, আজ সারা দেশে চলছে ভোগের তুমুল লড়াই, ত্যাগের নয়। ভোগের ময়দানে সৈন্যরা গিজগিজ করে, কিন্তু ত্যাগের ময়দান সৈন্যহীন।”

কৃষিশ্রমিক, ছুতার, বয়নশিল্পী, আর্টিস্ট, সার্ভেয়ার, কবি, বাঁশিয়াল, বিজ্ঞানী ও দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরই পারেন এমন করে বুকের গভীর হতে সমাজ বিশ্লেষণ করতে। কেবল তিনি পারেন সমাজের শিক্ষক হতে। বরিশালে কর্মসূত্রে আবদ্ধ হয়ে এই মহান দার্শনিকের স্মৃতি ছোঁয়া আমাকে গভীরভাবে আবিষ্ট করে, আলোড়িত করে। ২৫ লক্ষ লোকের বসতির মাঝে তাই আমি অবিরাম খুঁজে ফিরি নুতন জ্ঞানী, নুতন বিজ্ঞানী, সত্য দ্রষ্টা, সাহসী ও নতুন ধারার ভাবুককে। হয়তো আছেন, অনেকেই আছেন যাদের বুকে বারুদের ন্যায় উস্‌খুস করছে সৃষ্টি চেতনা ও প্রেরণা। হয়তো মঙ্গলজনক ও পরিবর্তিত পৃথিবী গড়ার জন্য ইতোমধ্যে কাজও করেছেন অনেকে। আমি দার্শনিকের সম্মানেই তাদের বিকাশ এবং একই সংগে অসুন্দরের অস্তগমন চাই।

উপসংহার অনুভবঃ এ জমিন বন্ধ্যা নয়। আমার বিশ্বাস যুগে-যুগে আরজ আলী সৃষ্টি হবে এই বাংলায়। হয়তো কীর্তনখোলার তীরে না হয় কপোতাক্ষ কূলে নয়তো বাংলার বুকে অন্য কোন খানে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস বাংলা হতে অসুন্দর দূর হবে, অন্ধকার দূর হবে সেইসব হাত ধরে ও আলোর মশালে। আর যদি তেমনটি অচিরেই না ঘটে তাহলে আমরা বারবার পাঠ করব আরজ আলী মাতুব্বর মহাশয়ের রচনা সমগ্র। আমরা কান পেতে শুনবো তার বাঁশি। আমরা আলপথে হেঁটে গিয়ে খুজবো তাঁর পদচিহ্ন। যেখানে তাকে পাবো, যেখানে তার সৃষ্টি পাবো, যেখানে তার প্রশ্নের উত্তর পাবো সেখানেই আমরা অঞ্জলি ভরে পান করবো জ্ঞানের অমিয় সুধা। আর আরজ জানাবো, হে অগ্রজ বন্ধু, তুমি সৃষ্টি-দানে অমর রহো, অম্লান রহো। সূর্যতেজে জ্বলে ওঠো অন্ধকার সকল খানে।

কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনঃ মুন্সী আবদুল করিম, মহব্বত আলী মাতুব্বর, হামজে আলী মাতুব্বর, আবদুল হামিদ মোল্লা দার্শনিকের জীবনে জ্ঞান সহযোগি ও আলোক বর্তিকা হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়া পরিণত জীবনে অধ্যাপক কাজী গোলাম কাদির, অধ্যাপক মুহাম্মদ শামসুল হক, অধ্যাপক আহমদ শরীফ, অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরের জীবন, স্মৃতি, কর্ম ও সৃষ্টিকে উম্মোচিত, জনপ্রিয় এবং পাঠকসমাদৃত করেছেন। নানাভাবে আরো যারা স্বশিক্ষিত লৌকিক দার্শনিক ও সত্য সন্ধানী আরজ আলী মাতুব্বরের জীবনে অপরিসীম অবদান রাখার জন্য তাঁদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

 

গ্রন্থসূত্রঃ

আরজ আলী মাতুব্বর রচনাসমগ্র, প্রকাশকঃ সহিদুল ইসলাম বিজু, পাঠক সমাবেশ।

বরিশালের প্রয়াত গুণীজন, রুসেলি রহমান চৌধুরি, ইউনিভার্সিটি বুক পাবলিশার্স।

Leave a Reply