সর্বশেষ সংবাদ
কালবৈশাখী মওসুম শুরু ফিটনেস ছাড়াই চলছে নৌযান

কালবৈশাখী মওসুম শুরু ফিটনেস ছাড়াই চলছে নৌযান

বিশেষ প্রতিবেদক ॥
উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বেড়েছে দক্ষিণাঞ্চলবাসীর। কালবৈশাখী মওসুম শুরু হয়ে গেছে। প্রতি বছর নৌদুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন কয়েকশ’ যাত্রী। বিশেষ করে কালবৈশাখী মওসুমে যাত্রীদের মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে চলতে হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি লঞ্চ মালিক ও সংশ্লিøষ্ট সংস্থাগুলোর নানা গাফিলতির কারণে প্রতি বছর নৌ-দুর্ঘটনা ঘটছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে ফিটনেসবিহীন নৌযান চলাচল বন্ধ না করা। অন্যদিকে নৌদুর্ঘটনা রোধে নানা পদক্ষেপ রয়েছে শুধু কাগজে-কলমে। সম্প্রতি নৌমন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচ কারণে নৌদুর্ঘটনা ঘটছে। এক. নৌযানের কাঠামোগত ও কারিগরি ত্রুটি ও দুর্বলতা। দুই. নৌযান চালনার দুর্বলতা বা ত্রুটি। তিন. নৌযানের স্থিতিশীলতা বিনষ্টকারী পদ্ধতিতে যাত্রী ও মালবোঝাই। চার. ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী ও মালবোঝাই এবং পাঁচ. ঝড় বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এ পাঁচ বিষয়ের মধ্যে প্রায় সবই নৌযান পরিচালনা বা ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পর্কযুক্ত ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য। কেবল আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বহুল আলোচিত দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হচ্ছে নৌযানের, বিশেষ করে যাত্রীবাহী লঞ্চের কাঠামোগত ও কারিগরি ত্রুটি। অভিযোগ রয়েছে, বিআইডব্লিউটিএর একশ্রেণীর অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায় ফিটনেসবিহীন লঞ্চগুলো চলাচল করে থাকে। সারা বছরই চলছে এসব নৌযান।
এ ছাড়া চালকের অবহেলা, ভুল বা অবজ্ঞার কারণে লঞ্চ দুর্ঘটনায় হাজার হাজার নিরীহ যাত্রীর প্রাণহানি ঘটলেও সর্বোচ্চ শাস্তি তিন বছরের কারাদ-। আর সাথে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। ফাঁসি বা যাবজ্জীবন কারাদ-ের মতো গুরুদ- না থাকার ফলে বারবার নৌপথে অবহেলার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। অদক্ষ চালকদের কারণেই বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটছেÑ এমনটাই বলা হয়েছে প্রতিটি ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে। সর্বশেষ চালকের ভুলের জন্য পদ্মায় লঞ্চডুবিতে ৭৮ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। চালকের কঠোর শাস্তি না হওয়ার কারণ সম্পর্কে নৌমন্ত্রী শাজাহান খান সম্প্রতি বলেছেন, এ ধরনের অপরাধের জন্য আইন পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত এর বেশি শাস্তি দেয়া সম্ভব নয়। নৌদুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের সদস্যরা জানান, বর্তমান প্রচলিত আইন সংশোধন করা জরুরি। নৌমন্ত্রণালয়ের দেয়া এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে গত ২০ বছরে দেশে নৌদুর্ঘটনার জন্য ৩৮৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫০টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। প্রচলিত আইন অনুযায়ী দোষীদের সর্বোচ্চ ৯ বছরের কারাদ- এবং বিভিন্ন অঙ্কের জরিমানা করা হয়েছে। সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত তিপূরণ আদায় করা হয়েছে।
সারাদেশে ফিটনেসবিহীন কতগুলো নৌযান রয়েছে তার কোনো পরিসংখ্যান সরকারের কোনো সংস্থার কাছে নেই। এরমধ্যে রয়েছে যাত্রীবাহী লঞ্চ, ট্রলার, নৌকা ও কার্গো-ভেসেল। যাত্রীদের অনেকেই বলেছেন, ফিটনেস এখন অনেকটাই ‘আইওয়াশ’। তবে বিআইডব্লিউটিএর একজন কর্মকর্তা জানান, দুর্ঘটনা এড়াতে ফিটনেস পরীক্ষার পাশাপাশি দেশের আট উপকূলে প্রয়োজনে নৌ-রুট বন্ধ ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত আছে।
চলাচলের অযোগ্য, বিশেষ করে ফিটনেসবিহীন নৌযানের কারণেই সাধারণত দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, একশ্রেণীর অসাধু নৌ কর্মকর্তার যোগসাজশে সংশ্লিøষ্ট মালিকেরা অযোগ্য লঞ্চ ও অন্যান্য নৌযান চলাচলের সুযোগ পান। দেখা গেছে, মূল ডিজাইন পরিবর্তন করার পরও ফিটনেস সার্টিফিকেট দেয়া হয়েছে এমন অসংখ্য নৌযান দেশের বিভিন্ন রুটে চলাচল করছে। এ ধরনের ‘ইন্সপেকশন রিপোর্ট’ প্রচুর থাকা সত্ত্বেও প্রভাবশালী মহলের কারণে মন্ত্রণালয় কোনো পদপে নিতে পারেনি। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত ছিল, যাত্রীবাহী নৌযানের খোলকে ওয়াটার টাইট না করা পর্যন্ত ফিটনেস সনদ দেয়া হবে না। হাইড্রোলিক স্টিয়ারিং ও ইকো সাউন্ডার সংযোগ করে যারা লঞ্চ চালাবে কেবলমাত্র তাদেরই রুট পারমিট দেয়া হবে। কিন্তু ব্যবস্থাপনা ও পদ্ধতিগত উন্নয়ন এবং তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করার মাধ্যমে নৌনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
চলাচলের অনুপযোগী ‘সি’ ক্যাটাগরির যাত্রীবাহী লঞ্চগুলো আগের মতোই ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। বর্তমান ও বিগত সরকারের আমলে এ লঞ্চগুলো চলাচলের ওপর একাধিকবার বিধিনিষেধ আরোপের চেষ্টা করে ব্যার্থ হয়েছে নৌমন্ত্রণালয়। প্রভাবশালী লঞ্চ মালিকদের মধ্যে হস্তক্ষেপে মন্ত্রণালয়ের চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। দুর্ঘটনায় শত শত যাত্রীর করুণ মৃত্যু হলেও লঞ্চ মালিকেরা সব সময় পার পেয়ে গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি পদ্মায় লঞ্চডুবি ঘটেছে। এ দিন দুর্ঘটনায় পড়ে এমভি মোস্তফা-৩ নামে একটি লঞ্চ। কমফোর্ট লাইন ও রাজধানী এক্সপ্রেস নামে দু’টি বাসের দেড় শতাধিক যাত্রী ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জে যাচ্ছিল। নগরবাড়ী থেকে ঢাকাগামী কার্গো জাহাজ এমভি নার্গিস-১ লঞ্চটির মাঝামাঝি অংশে আঘাত করলে ডান দিকে কাত হয়ে ডুবে যায়। এ লঞ্চডুবির ঘটনায় ৭৮ জনের লাশ উদ্ধার হয়। ঝড়বৃষ্টি ছাড়া অনুকূল আবহাওয়ার মধ্যে চালকের খামখেয়ালির কারণে দিনে দুপুরে এ দুর্ঘটনায় হতবাক সব পক্ষ। এ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কার্গো জাহাজ এমভি নার্গিস-১ চালকসহ তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে আবারো তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর। এর আগে একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায়। সেখানে লঞ্চডুবিতে হতাহতের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত লঞ্চ এবং ওই লঞ্চকে আঘাতকারী মালবাহী জাহাজের মালিককে দায়ী করে তদন্ত কমিটি বলেছে, তারা অদ চালক দিয়ে নৌযান চালানোর কারণেই ওই দুর্ঘটনা ঘটে। গত বছর ১৩ মার্চ গভীর রাতে গজারিয়ার মেঘনা নদীতে সিটি-১ কার্গো জাহাজটির ধাক্কায় শরীয়তপুর-১ নামের যাত্রীবাহী লঞ্চটি ডুবে গেলে ১৪৭ জনের বেশি যাত্রীর প্রাণহানি ঘটে। পরে ১৭ এপ্রিল মুন্সীগঞ্জের লঞ্চ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী সিটি-১ কার্গোকে আটক করে জাহাজের ১২ কর্মীকে পুলিশে সোপর্দ করে কোস্টগার্ড। ওই ঘটনায় তদন্ত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই রাতে এমভি শরীয়তপুর-১ লঞ্চে ১৬০ থেকে ১৭০ জন যাত্রী এবং লঞ্চের ডেকে প্রায় ২০০ বস্তা মরিচ ছিল। এ কারণে যাত্রীরা ডেক ছেড়ে ছাদে অবস্থান নেন। ওই অবস্থার মধ্যেই লঞ্চের চালক বেপরোয়া চালাচ্ছিলেন। এ ছাড়া সরকারি আদেশ লঙ্ঘন করে রাতে চলাচলকারী মালবাহী জাহাজ সিটি-১ চালকও বেপরোয়া চালাচ্ছিলেন বলে মনে করেছে তদন্ত কমিটি। ওই জাহাজের আঘাতের পরপরই লঞ্চটি ডুবে যায়।
অন্য দিকে নৌদুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে বহুল আলোচিত ‘নৌদুর্ঘটনা প্রতিরোধ প্রকল্প’ এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। এখনো লাল ফিতায় বন্দী এটি। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে নৌদুর্ঘটনার হার অনেকাংশে কমে আসবে বলে জানান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। প্রায় ৪০ কোটি টাকার এ প্রকল্পের ফাইলটি কয়েক বছর ধরে লাল ফিতায় আটক রয়েছে। নৌদুর্ঘটনা প্রতিরোধ প্রকল্প অনুযায়ী এ প্রকল্পে তিনটি উপকরণ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে, স্থানীয়ভাবে আবহাওয়া বার্তা সংগ্রহ করে নৌযানগুলোকে সতর্কীকরণের জন্য ১১টি স্থানে আবহাওয়া কেন্দ্র স্থাপন, নিরাপদ জাহাজ নির্মাণের জন্য টোয়িং ট্যাংক স্থাপন ও ইনকাইনেশন টেস্ট এবং বিদ্যমান নৌযানগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করতে একটি রিভলবিং ফান্ড গঠন। গুরুত্বপূর্ণ যে ১১টি স্থান হলো সেগুলো হচ্ছে আশুগঞ্জ, নরসিংদী, নারায়নগঞ্জ, চাঁদপুর, বরিশাল, কাউখালী, পটুয়াখালী, রামগতি, পাটুরিয়া বা আরিচা, বাঘাবাড়ী ও মাওয়া। যেখানে সেখানে লঞ্চ তৈরি করা যাবে না। শুধু সরকারের তালিকাভুক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন ডকইয়ার্ডগুলোতেই লঞ্চ তৈরি করা যাবেÑ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের সিদ্ধান্তও এখনো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ঢিলেঢালা প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে চলাচলের অযোগ্য লঞ্চ যাত্রী নিয়ে চলাচল করছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এর এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ১৯৭১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৪২ বছরে নৌদুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ১০ হাজার ৩১৬ জন যাত্রীর। এর মধ্যে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে শতাধিক। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয় ২০১৩ সালে। এ বছর তিনটি বড় দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় এক হাজার ১০৫ জনের। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে প্রায় ২০ হাজার। প্রায় ২০০ মামলা নিষ্পত্তি হলেও দোষী কারো বিরুদ্ধে শাস্তি হয়নি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। ২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ হাজার ২৭২ টি লঞ্চমালিককে ফিটনেস পরীক্ষার জন্য চিঠি দেয়া হয়। দুই হাজার ৮২টি নৌযান পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কাগজপত্র জমা দিলে এক হাজার ৩৫৪টি লঞ্চকে ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি এসব নৌযানের সার্ভে সনদ বাতিলের জন্য উর্দ্ধতন মহলে সুপারিশ পাঠালেও তা আর কার্যকর হয়নি। বিশেষ করে ঈদ মওসুমে এসব চলাচলের অযোগ্য নৌযানের গায়ে রঙ লাগিয়ে চালানো হয়। এ ছাড়া শুরু হয়েছে কালবৈশাখী মওসুম। এ মওসুমে এ ধরনের যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে বলে আশঙ্কা যাত্রীদের।

Leave a Reply