সর্বশেষ সংবাদ
জয়নুল আবেদীন

জয়নুল আবেদীন

বাংলাদেশের চিত্রকলার অন্যতম প্রধান পথিকৃত জয়নুল আবেদীন। চিত্রশিল্পে অবদানের জন্য তাকে শিল্পাচার্য নামে ডাকা হয়। তার বিখ্যাত চিত্রকর্মের মধ্যে রয়েছে- দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা, সংগ্রাম, সাঁওতাল রমণী ও ঝড়সহ আরও অনেক ছবি। ১৯৬৯ সালে গ্রাম বাংলার উৎসব নিয়ে আঁকেন ৬৫ ফুট দীর্ঘ চিত্রকর্ম নবান্ন এবং ১৯৭০ সালে আঁকেন ঘূর্ণিঝড়ে হারিয়ে যাওয়া অজস্র মানুষের স্মৃতির উদ্দেশে ৩০ ফুট দীর্ঘ ‘মনপুরা’। ১৯৭৬ সালের এ দিনে (২৮ মে) বরেণ্য এ চিত্রশিল্পী ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

জয়নুল আবেদীন ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তবে সরকারি নথিপত্রে তার জন্ম তারিখ ১৯১৪ সালের ১৮ নভেম্বর। তার বাবার নাম তমিজউদ্দিন আহমেদ ও মা জয়নাবুন্নেছা। ব্রহ্মপুত্র নদের অত্যন্ত শান্ত ও সুনিবিড় পরিবেশে বেড়ে উঠেন। এ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তার চিন্তা পরিগঠনে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।

১৯৩৩ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টসে পড়েন। তার মা গলার হার বিক্রি করে আর্ট স্কুলে পড়তে সাহায্য করেছিলেন। ১৯৩৮ সালে ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদ নিয়ে আঁকা একগুচ্ছ জলরং ছবির জন্যে ১৯৩৮ সালে নিখিল ভারত চিত্র প্রদর্শনীতে গভর্নরের স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯৩৮ সালে শেষ বর্ষের ছাত্র থাকাকালে গভর্নমেন্ট স্কুল অফ আর্টসের শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন।

১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষকালে সৃষ্টি করেন দুর্ভিক্ষআশ্রিত অমর চিত্রমালা। সে সময় রাতদিন শুধু কলকাতার দুর্ভিক্ষের দৃশ্যাবলির স্কেচ করতে থাকেন। তুলির বলিষ্ঠতা ও সাবলীলতা আবার প্রাণ পেয়েছে এ সময়ের কাজে। অধিকাংশ কাজ জলরঙ বা সোয়াশে করা। ব্যবহৃত জলরঙের বৈশিষ্ট্য হালকা ও অনুজ্জ্বল, তুলির টান ও কম্পোজিশনের ব্যবহার অত্যন্ত প্রাচ্যধর্মী। দুর্ভিক্ষ নিয়ে সে বছরই কলকাতায় এক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়, তাতে জয়নুল দুর্ভিক্ষের ছবি নিয়ে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর ঢাকার আরমানিটোলার নর্মাল স্কুলে আর্ট শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৪৮ সালে ঢাকাতে প্রদেশের প্রথম আর্ট স্কুল গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অফ আর্টস প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন। তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। এর বর্তমান পরিচয় চারুকলা ইনস্টিটিউট।

১৯৫১-৫২ সালে সরকারি বৃত্তি নিয়ে এক বছরের জন্যে ইংল্যান্ডে যান। সেখানে অবস্থানকালে বিভিন্ন চারুকলা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও নিজের শিল্পকর্মের প্রদর্শনীও করেন। বেশ প্রশংসাও লাভ করেন। ১৯৫০ এর দশকের প্রথম দিকে জয়নুল গ্রাম বাংলার অতিসাধারণ প্রাত্যহিক অথচ অত্যন্ত প্রতীকী গুরুত্বসম্পন্ন দৃশ্যাবলী আঁকেন। ১৯৫২ সালে দেশে ফিরে স্থানীয় শিল্প-ঐতিহ্যের সঙ্গে পাশ্চাত্যের শিল্প-আন্দোলন ও কৌশলের সমন্বয়ে ব্রতী হন। এ সময়ে তার আলোচিত চিত্রকর্মের মধ্যে রয়েছে- ঝড়, মই দেয়া, নৌকোর গুণটানা, পল্লী-রমণী, আয়না নিয়ে বধূ, একাকী বনে, পাইন্যার মা, মা ও শিশু, তিন পল্লী রমণী, মুখ চতুষ্টয় প্রভৃতি।

১৯৭০ সালে আল-ফাতাহ গেরিলাদের সাথে চলে যান মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধফ্রন্টে। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি আঁকেন ও একাধিক আরব দেশে প্রদর্শনী করেন। ওই বছর প্রলয়ঙ্করী ঝড় আঘাত হানে পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় এলাকায়। রিলিফ টিমের সঙ্গে ছুটে যান দুর্যোগাক্রান্ত এলাকায়। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পরপরই লেগে যান শিল্পচর্চা সংগঠনের কাজে। প্রাধান্য পেতে থাকে লোকশিল্প। এ সময় বাংলাদেশের সংবিধানের অঙ্গসজ্জার দায়িত্ব পান।

১৯৭২-১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উপদেষ্টা মনোনীত হন। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়াস্থ ‘কংগ্রেস ফর ওয়ার্ল্ড ইউনিটি’র সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় অধ্যাপক নিযুক্ত হন ও আমৃত্যু এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

তার স্বপ্নের কাজ ছিল ‘লোকশিল্প জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠা। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ এক প্রজ্ঞাপনবলে তৎকালীন সরকার সোনারগাঁও পানাম নগরে অস্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ লোকজ ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন। পরে ১৯৮১ সালে পানাম নগরের কাছাকাছি শ্রী গোপীনাথ সর্দার বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। ১৯৯৮ সালের ৬ মে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়। নিজের ছবি সংগ্রহের জন্য ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরের একটি পুরাতন ভবনে ১৯৭৫ সালে ময়মনসিংহে জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি জীবনে প্রায় ৫৫০০ স্কেচ এবং ছবি আঁকলেও বর্তমানে তার মাত্র ৩৫০০ ছবি পাওয়া যায়।

১৯৪৬ সালে জাহানারা বেগমের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। এ দম্পতির তিন ছেলে।

ছয়মাস ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগে ১৯৭৬ সালের ২৮ মে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে হাসপাতালে শুয়ে শেষ ছবিটি আঁকেন। সে চিরচেনা কালো কালি আর মোম ব্যবহারে বলিষ্ঠ মোটা রেখায় ফুটে উঠে ‘জোড়ামুখ’।

Leave a Reply