সর্বশেষ সংবাদ
দেউলিয়া দায়বোধ

দেউলিয়া দায়বোধ

দুদিন ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের টাইমলাইনে একটি ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে, যা দেখে আমার বারবার মনে হয়েছে গোটা বাংলাদেশটাই কান ধরে উঠ-বস করছে। মানবিকতা আর সৃজনশীলতার কতটা অবক্ষয় ঘটলে একজন শিক্ষককে এই অবস্থায় পড়তে হয় সে হিসাব মেলানো সহজ নয়। কিন্তু চলমান এই সমাজব্যবস্থার নাটাই কার হাতে, কে নির্ধারণ করছে সামাজিক মূল্যবোধের মাপকাঠি? যেখানে সমাজ গড়ার কারিগরকেই হতে হচ্ছে মানব দস্যুদের বিকৃত উল্লাসের শিকার?

আসলে গেল এক দশকে দেশের গ্রামীণ কিংবা শহুরে, দুটো সমাজেই মৌলিক কিছু পরিবর্তন এসেছে, যে ধারায় এ ধরনের অনাচারের দায় কিছুটা হলেও ওই শিক্ষক সমাজের ওপরও বর্তায়… বিবর্তনের ছোট্ট দুটো গল্প বলি…

১। ২০০০ সালে আমি ক্লাস এইটে পড়ি, সেকেন্ড টার্ম পরীক্ষায় আমি অংকে ফেল করেছিলাম, নম্বর জুটেছিলো সাকুল্যে ১৭। কিন্তু বিষয়টা আমার জন্য খুব প্রেস্টিজিয়াস হয়ে দাঁড়ায়, তড়িৎ সিদ্ধান্ত নিলাম, এহেন অপমান থেকে যে করেই হোক বাঁচতে হবে। মাথায় চলেও এলো দুর্দান্ত এক আইডিয়া। ১৭’র ডিজিট দুইটা উলটে দিয়ে নম্বর বানিয়ে দিলাম ৭১। বলাবাহুল্য আমাদেরকে তখন বাড়িতে দেখানোর জন্য খাতা দিয়ে দেয়া হতো, পরে আবার জমা ও নিয়ে নিতেন শ্রদ্ধেয় শিক্ষকেরা। আব্বা যেহেতু বোর্ডের কর্মকর্তা ছিলেন, সেই সুবাদে নানা প্রয়োজনে শিক্ষকেরা প্রায়ই তার কাছে যেতেন, সে কারণেই আমার সেই কীর্তির কথা চাপা থাকলো না। জানাজানি হওয়ার পর, অংকের সেই শিক্ষক আমাকে টানা দেড় ঘণ্টা পিটিয়েছিলেন, লাঠি ভেঙেছেন, আমি দুই রুমের পার্টিশনের মধ্যে আশ্রয় নেয়ার পরও উনি আমাকে পেটানো ছেড়ে দেননি।

ঠিক সাত বছর পর, ওই শিক্ষকই, দশম শ্রেণির এক ছাত্রকে ক্লাসে বকা দিয়েছিলেন(মারেননি)। কিন্তু ওই ছাত্র তা সহ্য করেনি, বরং শিক্ষক বাড়ি ফেরার সময় বন্ধুদের নিয়ে তাকে পথে দাঁড় করিয়ে কলার ধরে মেরে ফেলার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে। কী এমন ঘটলো সাত বছরের ব্যবধানে?

২। আমি প্রথম প্রাইভেট পড়া শুরু করি, এসএসসিতে ফেল করার পর, সেই অংকেই। বাড়ি থেকে একটু দূরে একজন শিক্ষকের কাছে পড়তে যেতাম। একসাথে প্রায় বিশজনের মতো পড়াতেন তিনি, সেখানেই আমার চেয়ে বয়সে দু বছর ছোট এক মেয়েকে খুব ভালো লেগে গেল। কিন্তু তাকে মনের কথাটা কিভাবে বলবো, তার উপায়ই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আট মাসে তাকে ভালো লাগে এই কথাটুকুই বলতে পারিনি, শুধু শিক্ষকভীতির কারণে। পরবর্তী সময়ে কী হয়েছিলো তা আর নাই বা বললাম, এটুকু প্রাইভেসি অন্তত থাক।

কয়েক বছর পর ঢাকা থেকে যখন মাঝেমাঝেই বাড়িতে যাই, নানারকম গল্প শুনি শিক্ষকদের সম্পর্কে। আজকাল নাকি উনারা ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে সময়মতো টিউশনের টাকা আদায় করার জন্য তাদেরকে নিজ বাসাতেই প্রেম করার সুযোগ করে দেন। প্রথমে বিশ্বাস করিনি, কিন্তু পরে ঘটনার সত্যতা পেয়েছি খুব ভালোভাবেই। ওই শিক্ষকই চরমভাবে অপমানিত হলেন, দেন দরবার ঠিকঠাক না হওয়ায়, ফলে বিষয়টা জানাজানি হয়ে যায় পুরো এলাকায়।

দুটো ঘটনা অলংকার মাত্র, আমার এলাকার (যশোর) একমাত্র কলেজের বেশ কয়েকজন শিক্ষক গেল দশ বছরে অনেকবার নিগৃহীত হয়েছেন শুধু শিক্ষার্থীদের হাতেই। এলাকার একমাত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষককে তো একবার ছুরিকাঘাতও করা হয়েছে। পত্র-পত্রিকায় দেখেছি, প্রেমে বাধা দেয়ায়, ইভটিজিংয়ে বাধা দেয়ায়, পরীক্ষায় নম্বর কম দেয়ায়, নকল করতে না দেয়ায় সারাদেশে অসংখ্য শিক্ষক লাঞ্ছিত হয়েছেন নিজ শিক্ষার্থীদের হাতেই। আর হালের কিন্ডারগার্টেন কিংবা প্রাইমারি, হাইস্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের একাধিক গ্রুপিংয়ের গল্পতো ডালভাতের মতো। সুতরাং এসব ঘটনা এমনি এমনি ঘটেনি, এখানে মর্যাদা হারিয়ে ফেলার দায় সেই সব শিক্ষকেরও কিছু কম নয়।

আর সে কারণেই বলছি, গুমগঞ্জে একজন জনপ্রতিনিধির হাতে শিক্ষক লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাতে আমি খুব বেশি ব্যথিত নই। অন্তত সমাজের দোষ গুণ বিচার আচারের ভার কিছুটা হলেও তো রাষ্ট্রi তাকে দিয়েছে, সে তো তা করতেই পারে… তবে জনরায়হীন প্রতিনিধি বলেই কি না এখানে জনতার ইচ্ছা উপেক্ষিত থাকাটাই স্বাভাবিক… রাষ্ট্র কি অন্ধ?

Leave a Reply