সর্বশেষ সংবাদ
কোরবানির ধর্মীয় গাম্ভীর্য শালীনতা চাই, কটূক্তি ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়

কোরবানির ধর্মীয় গাম্ভীর্য শালীনতা চাই, কটূক্তি ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়

মহান আল্লাহতালার নৈকট্য লাভে মুসলমান ধর্মে সামর্থ্যবান মানুষেরা পবিত্র ঈদুল আজহার নামাজের পর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে আত্মত্যাগের মহিমায় যে কোরবানি দান করেন তা মুসলমানদের পিতা হজরত ইব্রাহিম (রা.) সময়কাল থেকে শুরু। মহান আল্লাহর গায়েবি আদেশে অবনত মস্তকে হজরত ইব্রাহিম(রা.) তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে(রা.) কোরবানি দিতে পর্বতে নিয়ে যান। আল্লাহর নির্দেশে পুত্রকে কোরবানি দিতে তিনি যখন প্রস্তুত তখনই মহান স্রষ্টা তাঁর কুদরতি ক্ষমতায় পশু পাঠিয়ে পুত্রের বদলে তা কোরবানি করান। আল্লাহর নৈকট্য লাভে তাঁর নির্দেশ পালনে নিঃশর্তভাবে হজরত ইব্রাহীম(আ.) আত্মত্যাগের যে মহান আন্তরিকতা দেখান- সেটি কবুল করা হয়। সেই থেকে সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য চার পা বিশিষ্ট গৃহপালিত পশু কোরবানি দিয়ে আসছেন। ঈদুল আজহার দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করে পবিত্রতার সঙ্গে বান্দা তাঁর সৃষ্টিকর্তার করুণা লাভের জন্য দোয়া দরুদ পরে আল্লাহর নামে পশু কোরবানি দিয়ে আসছেন। সামর্থ্য অনুযায়ী কেউ উট, গরু, দুম্বা, ছাগল, মেষ, ভেড়া কোরবানি দিয়ে থাকেন।

শান্তি ও মানবতার ধর্ম ইসলাম। ইসলাম সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্যই কেবল কোরবানি দানকে ওয়াজিব হিসেবে নির্ধারিত করেছেন। এমনকি একটি বড় পশুও সাত জনের নামে কোরবানি দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে এবং প্রতিটি কোরবানির মাংসের তিন ভাগের একভাগ গরিব-মিসকিনদের জন্য, এক ভাগ আত্মীয় পাড়া-প্রতিবেশীদের জন্য এবং আরেক ভাগ নিজেদের জন্য বণ্টন ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। মুসলিম জাতির জন্য ইসলাম যে পাঁচটি ফরজ নাজিল করেছে, তাঁর মধ্যে ঈমান সর্বপ্রথম। ঈমান অর্থাৎ আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি গভীর বিশ্বাস স্থাপন করে ধর্মীয় বিধি-বিধান ও অনুশাসন মেনে চলার কথা বলা হয়েছে। বাকি চারটি স্তম্ভের মধ্যে রয়েছে নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত। এটি এমন এক বিধি ব্যবস্থা যা শুধু আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশই নয়, মানুষের প্রতি মানবিক দায়বদ্ধতার পথ সুগম করেছে। ইসলাম শুধু ঘুষ, সুদ, ব্যভিচারকে হারামই করেনি, অন্যের ক্ষতিসাধন মিথ্যাচার গিবত করা, জুলুম করা শ্রমিকের মজুরি না দেওয়া, এতিমদের হক বা পাওনা বুঝিয়ে না দেওয়া, লোভ-লালসা, ঈর্ষা, হিংসা-বিদ্বেষ, মানুষ হত্যাকে গর্হিত অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। নামাজ রোজা হজ জাকাতের ক্ষেত্রে যারা অর্থনৈতিক ও শারীরিকভাবে অক্ষম তাঁদের জন্য অনেক শিথিলতা দিয়েছে। কিন্তু আমরা অনেকেই ইসলামের বিধি-বিধান অনুশাসন লঙ্ঘন করে সমাজ জীবনে মানবিক গুণাবলী হারিয়ে পথ চলছি, যা কাম্য নয়। আমরা ধর্মের নামে যেমন জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, মানুষ হত্যার মতো গর্হিত অপরাধ করছি। সকল বিচারের মালিক যেখানে আল্লাহ্, সেখানে ধর্মীয় অনুশাসনের সীমানা লঙ্ঘন করে যাকে তাঁকে হত্যা নির্যাতন করার মতো বিচারের ক্ষমতা হাতে তুলে নিচ্ছি। মাদক, ড্রাগ, ব্যবসার বিস্তার ঘটিয়ে মুনাফা লাভের আশায় অপরাধের পথে পা বাড়াচ্ছি। আমরা ধর্মে হারাম বলার পরও ঘুষ বাণিজ্যকে সামাজিক মর্যাদা দিয়েছি। ধর্মে অহংকারীর পতন অনিবার্য বলার পরও বিত্ত ও ক্ষমতার ক্ষণস্থায়ী মিথ্যা দম্ভে সমাজ জীবনে অস্থিরতা তৈরি করছি। এমনকি মানুষের জায়গা-জমি দখল করে নিচ্ছি। শেয়ারবাজার, ব্যাংকিং খাতে গরিব মানুষের অর্থ লুট করে নিচ্ছি। এতিমের তহবিল তসরুফ করছি। রাত নামলেই মদ ও নারী আসক্তিতে ডুবছি। যৌতুকের জন্য লালায়িত হচ্ছি, নারীর সম্মান সম্ভ্রম হরণ করছি। কিন্তু সাম্প্রতিককালে দেখা যাচ্ছে- মূল্যবোধকে নির্বাসনে পাঠিয়ে চোখের পর্দা সরিয়ে দিয়ে বছরে বছরে হজ পালন করছি। যখন তখন উমরা হজে যাচ্ছি। খরচের অর্থ বৈধ না অবৈধ সেদিকে তাকাচ্ছি না। সামর্থ্য থাকলেও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পরি আর নাই পড়ি, ঘুষ-দুর্নীতি থেকে দূরে নাই থাকি, কোরবানির হাঁটে গিয়ে চড়া দামে বড় উট বা সবচেয়ে দাম হাঁকানো গরুটি কিনে এনে কোরবানি দিচ্ছি। ফেসবুকের সুবাদে গর্বের সঙ্গে মূল্যসহ সেটি জানান দিয়ে মিথ্যা সামাজিক মর্যাদা নেওয়ার অপপ্রয়াশ চালাচ্ছি। এমনকি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য পবিত্রতা ও শালীনতাবোধ হারিয়ে জবাই করা পশু নিয়ে ফেসবুকে আত্মপ্রচারের নামে দৃষ্টিকটু ছবি পোস্ট দিচ্ছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্মীয় সামাজিক মূল্যবোধের সীমা লঙ্ঘনের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় অন্যের মধ্যেও সংক্রমিত করছি। এই বিষয়টি ধর্মপ্রাণ মুসলমান অনেককেই মর্মাহত এবং ব্যথিত করেছে। আমার কাছেও এটি গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তাই বিবেকের তাড়নায় আত্ম উপলব্ধির জায়গায় দাঁড়িয়ে এই ভুল ধারা থেকে সবাই যাতে বেড়িয়ে আসতে পারে সেজন্য মনে করেছি কিছু বলা দরকার। সবার মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আল্লাহ্‌ পৃথিবীর তাবৎ মুসলমানের কোরবানি কবুল করে নিন এই মনোবাসনা থেকেই লিখেছিলাম ‘কোরবানি মানে টাকার গরম দেখিয়ে হাঁট থেকে বড় পশুটি কিনে কোরবানি দান ও অশ্লীলতা নয়, ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পবিত্রতার সহিত হৃদয় মন উজাড় করে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য আত্মত্যাগের মহিমায় কোরবানি দেবো কিন্তু এ নিয়ে বাড়াবাড়ি নয়। স্বয়ং আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিন সীমা লঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না।

আমার লেখাটি ফেসবুকে শেয়ার করলে অনেকেই তির্যক বাক্যবাণে সমালোচনার তীর ছুড়েছেন। আমি নিশ্চিত, তাঁরা গভীর মনোযোগ দিয়ে লেখাটি পড়েননি। কাউকে ব্যথিত করার জন্য নয়, আমাদের কোরবানির মহত্ব পরিমিতিবোধ বজায় রেখে গৌরবের উত্তরাধিকারিত্ব বহনের ধারা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করেছি মাত্র। এই নৈতিক দায়বদ্ধতা আমাদের সবার। আমি নিজে একটি ধর্মপ্রাণ মুসলমান পরিবারের সন্তান। ছোটবেলা থেকেই নামাজ ও কোরআন তেলোয়াতে অভ্যস্ত। নিয়মিত নামাজ পরার চেষ্টা করি। ব্যক্তি জীবনে হজ পালন করেছি এমনকি জাকাত দানেও আমি সতর্ক ও সজাগ। সন্তানদেরকেও সৎ জীবনযাপনে পরামর্শ দিয়ে থাকি। আল্লাহ্ আমাদের শয়তান থেকে দূরে রাখুন। সকল ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানুষকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ থাকার তৌফিক দিন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করে আমরা যেন আমাদের ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলি। এবার কোরবানির দিন ঢাকা নগরীতে দিনভর বৃষ্টির কারণে যে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছিল, সেই দৃশ্য দেখে অনেকের মনে হয়েছে- এ যেন রক্তনদী। পশুর বর্জ্য দ্রুত অপসারণে আমরা এখন অনেক এগিয়েছি। বিদেশ বিভুয়ে পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে সুরক্ষিতভাবে কোরবানির ব্যবস্থা নির্দিষ্ট করা আছে। আমাদের এখানে যত্রতত্র কোরবানি না করে নির্দিষ্ট জায়গা নিশ্চিত করা দরকার।

আমার লেখার সঙ্গে যারা দ্বিমত পোষণ করেন তাঁদের প্রতি অনুরোধ, যেকোনো বিষয়ে বিতর্ক বা আইডিয়া বিনিময় গ্রহণযোগ্য। ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিচার বুদ্ধিহীন কটূমন্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা কোরবানি দেব। এতে পরিবেশ যেমন রক্ষা করবো তেমনি তাঁর রুচি, সৌন্দর্যবোধ, শালীনতা, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য পবিত্রতাও রক্ষা করবো।

লেখক: সাবেক পরিচালক, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্চ। উপদেষ্টা, পূর্বপশ্চিমবিডি.নিউজ

Leave a Reply