সর্বশেষ সংবাদ
স্বাস্থ্যসূচকে পিছিয়ে বরিশাল অঞ্চল

স্বাস্থ্যসূচকে পিছিয়ে বরিশাল অঞ্চল

শিশির মোড়ল বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে জনবল-সংকট দীর্ঘদিনের। কেন্দ্রে চিকিৎসকের পদ আছে ২১টি, কাজ করছেন ৯ জন।মানুষ যে উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সেবা না পেয়ে সদর হাসপাতালে গিয়ে সেবা পাবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। সদরে পরিস্থিতি উপজেলার চেয়ে ভালো নয়।সদর উপজেলার কুমিরপাড়া গ্রামের আছিয়া বেগম সদর হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে খুলনায় চলে যান। তিনি বলেন, ‘আমার কানে সমস্যা। পিরোজপুর সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখি নাক-কান-গলার ডাক্তার নেই। উপায় না পেয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার দেখাই।’পিরোজপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসকের পদ আছে ৩৩টি। এর মধ্যে ২২টি পদে লোক নেই। অর্থাৎ ৬৬ শতাংশ চিকিৎসকের পদ শূন্য। এই পরিস্থিতি শুধু মঠবাড়িয়া উপজেলা বা পিরোজপুর জেলার নয়, সমগ্র বরিশাল বিভাগের।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় (বরিশাল) পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ বিশ্বাস কে বলেন, বরিশাল বিভাগে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর ৫০ শতাংশ পদ শূন্য। এই পরিস্থিতিতে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া কঠিন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বরিশাল, ভোলা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি ও বরগুনা—বিভাগের এই ছয় জেলা স্বাস্থ্যসেবা-বৈষম্যের শিকার। পর্যাপ্ত জনবল না থাকার কারণে মাঠপর্যায়ে কাজ কম হচ্ছে, যে কাজ হচ্ছে তার ওপর নজরদারি নেই। চিকিৎসাশিক্ষা, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সক্ষমতা, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের চিকিৎসাসেবাসহ স্বাস্থ্যের নানা কিছু সূচকে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে পিছিয়ে পড়েছে বরিশাল বিভাগ।

দেশের আঞ্চলিক স্বাস্থ্যবৈষম্য নিয়ে গবেষণা করছেন অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান।  তিনি বলেন, মূলত ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণেই এমন হয়েছে। এই বিভাগের অনেক কিছু দৃষ্টির বাইরে থেকে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, এই এলাকার বিষয় জোরালোভাবে সরকারের কাছে তুলে ধরার মতো রাজনৈতিক শক্তিরও অভাব আছে।

বৈষম্য: বরিশালে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়েছিল ১৯৬৮ সালে। এরপর গত বছর পটুয়াখালীতে একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ চালু হয়েছে। এই দুটি ছাড়া বিভাগের ছয় জেলায় আর কোনো মেডিকেল কলেজ নেই। দেশে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ এখন ৬৬টি। কিন্তু এই বিভাগেই কোনো বেসরকারি মেডিকেল কলেজ নেই। দেশে আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ আছে আটটি। কিন্তু বরিশালে নেই।

শুধু মেডিকেল কলেজই নয়, ডেন্টাল কলেজ, নার্সিং কলেজ, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্স ট্রেনিং স্কুল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও বরিশাল বিভাগ অন্যান্য বিভাগের থেকে পিছিয়ে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে চিকিৎসকদের ৮ শতাংশ পদ শূন্য। ঢাকা বিভাগে শূন্যপদ ৩ শতাংশ। শূন্যপদের হার সবচেয়ে বেশি বরিশাল বিভাগে, ১৫ শতাংশ। এ ব্যাপারে বিনয় কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, বরিশাল বিভাগে নদীনালার কারণে যাতায়াতে কিছু সমস্যা আছে। অন্য বিভাগ থেকে কেউ আসতে চায় না। যাঁরা আছেন, তাঁদের অধিকাংশ এই বিভাগের মানুষ এবং তাঁরা শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা।

বৈষম্যের ফল: স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও এই বিভাগ দেশের বাকি অঞ্চলের চেয়ে পিছিয়ে আছে।
সর্বশেষ (২০১৪) জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপে বলা হয়েছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ১৬ দশমিক ৪ শতাংশকে অসুস্থ হলে কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয় না। বরিশাল বিভাগে এই হার সবচেয়ে বেশি, ২৩ শতাংশ। এই হার সবচেয়ে কম রংপুর বিভাগে, ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ।

প্রসবপূর্ব সেবার জন্য একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নির্দেশিকা, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী, রক্তচাপ পরিমাপযন্ত্র, রক্তের হিমোগ্লোবিন পরিমাপযন্ত্র, প্রস্রাবে প্রোটিন নির্ণয় যন্ত্র ও আয়রন বা ফলিক অ্যাসিড বড়ি—এই ছয় উপকরণ থাকতে হয়। কিন্তু স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো কতটা প্রস্তুত, সে বিষয়ে সর্বশেষ জাতীয় জরিপে (২০১৪) দেখা গেছে, বরিশাল বিভাগে সব উপকরণ আছে ২ দশমিক ২ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। জাতীয় হার ৪ দশমিক ৩ শতাংশ।

সরকার স্বাভাবিক প্রসবের ওপর জোর দিচ্ছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্বাভাবিক প্রসবের জন্য প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীসহ ১৩ ধরনের উপকরণ থাকা দরকার। ওই জরিপে দেখা গেছে, স্বাভাবিক প্রসবের জন্য বরিশাল বিভাগের মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রস্তুত। জাতীয়ভাবে এই হার ২ দশমিক ১ শতাংশ।

বরিশাল বিভাগের এই স্বাস্থ্যসেবা-বৈষম্যের ব্যাপারে হোসেন জিল্লুর বলেন, একসময় উত্তরবঙ্গ অনেক পিছিয়ে ছিল। যমুনা সেতু হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলেছে। পদ্মা সেতু হলে বরিশালের অবস্থাও বদলে যাবে।

বরিশাল বিভাগের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা করতে হবে বলে মত দিয়েছেন সেভ দ্য চিলড্রেনের উপপরিচালক ইশতিয়াক মান্নান। তিনি বলেন, এই বিভাগ সবচেয়ে বেশি জলবায়ু-ঝুঁকির মুখে। এই বিভাগ থেকে অভিবাসন বেশি হচ্ছে, জনসংখ্যা বাড়ছে না। দেশের অন্য সব এলাকার জন্য স্বাস্থ্য পরিকল্পনা এই বিভাগে সমান ফল আনবে না।

সূত্রঃ প্রথম আলো

Leave a Reply