সর্বশেষ সংবাদ
সাদিক আবদুল্লাহ’র হস্তক্ষেপে নগরবাসীর ময়লা যন্ত্রণার অবসান

সাদিক আবদুল্লাহ’র হস্তক্ষেপে নগরবাসীর ময়লা যন্ত্রণার অবসান

রুবেল খান ॥ মহানগর আওয়ামী লীগ’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ’র হস্তক্ষেপে অবশেষে অসহ্য ময়লা-আবর্জনা যন্ত্রনা থেকে মুক্তি মিললো নগরবাসীর। পর্দার অন্তরালে থেকে তিনি দিক নির্দেশনা দিয়েছেন আন্দোলন প্রত্যাহারের বিষয়ে। তার দিক-নির্দেশনার কারনেই টানা ৭ দিনের ভোগান্তির অবসান হয়েছে। বকেয়া বেতন এর দাবিতে বিসিসি’র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চলমান আন্দোলন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। আন্দোলনরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুই মাসের বকেয়া বেতন এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডের (পিএফ) ৫টি কিস্তি পরিশোধের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন। তাছাড়া চলতি মাসের ২৫ মার্চ পর্যন্ত কর্পোরেশনে আদায়কৃত সকল টাকাই বকেয়া বেতন বাবদ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন মেয়র আহসান হাবিব কামাল। এমন চুক্তি এবং সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে কর্মসূচি প্রত্যাহার ঘোষনা দিয়েছেন আন্দোলনরত সহ¯্রাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। গতকাল রোববার বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নগর পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা- সিটি মেয়র, প্যানেল মেয়র এবং কাউন্সিলর, কর্মকর্তা, সরকার দলীয় নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে রুদ্ধদার বৈঠক শেষে গতকাল সন্ধ্যায় আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষনা করেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পাশাপাশি গত এক সপ্তাহ ধরে জমে থাকা ময়লার ভাগারে পরিনত হওয়া নগরীর ময়লা আবর্জনা আজ সোমবারের মধ্যে সরিয়ে নেয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন পরিচ্ছন্ন কর্মীরা। এমনকি আন্দোলন প্রত্যাহার ঘোষনার পরপরই রোববার সন্ধ্যার পর থেকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করন কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছেন তারা।
এর পূর্বে গত ২৭ মার্চ থেকে ৫ মাসের বকেয়া বেতন, ৩২ মাসের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা পরিশোধের দাবীতে আন্দোলন শুরু করে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের নিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পাশাপাশি দুই মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবী জানায় দৈনিক মজুরী ভিত্তিক শ্রমিকরা। আন্দোলন কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২৭ মার্চ থেকে নিয়মিত এবং অনিয়মিত সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিসিসি’র প্রত্যেকটি শাখায় তালা ঝুলিয়ে দেয়ার পাশাপাশি কর্মবিরতি পালন এবং নগর ভবনের সামনে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি এবং বিক্ষোভ করে। পরিচ্ছন্ন কর্মীরা নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে বসবাসকারী এবং ব্যবসায়ীদের রাস্তার পাশে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলে রাখা ময়লা আবর্জনা পরিস্কার না করায় ময়লার ভাগারে পরিনত হয় গোটা নগরী। সাধারন মানুষ রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে পড়েন ভোগান্তিতে। ময়লার দুর্গন্ধে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ক্রেতা এবং বিক্রেতা কেউ মুখ না ঢেকে স্বাভাবিক ভাবে চলাচল করতে পারছিলো না। নগর ভবনে কার্যক্রম বন্ধ থাকায় পানি, বিদ্যুৎ, কর, প্লান, যানবাইন লাইসেন্স এবং ট্রেড লাইসেন্স পাওয়া সহ সকল ধরনের নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হয় নগরবাসী।
এর পরেও বরিশাল প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে গত বৃহস্পতিবার নগরবাসীকে জিম্মি করেই দাবী আদায়ের আন্দোলন চালিয়ে যাবার ঘোষনা দেয় কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শ্রমিকরা। এর ফলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় নগরবাসীর মাঝে। এর এক দিনের মাথায় গত শনিবার সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় না দিয়ে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেন বরিশাল সিটি মেয়র আহসান হাবিব কামাল। বিসিসি’র বর্তমান পরিস্থিতির জন্য নগরবাসীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন তিনি। পাশাপাশি আন্দোলনকারী স্থায়ী এবং অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ২ মাসের বেতন এবং ৫টি প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা পরিশোধের ঘোষনা দেন তিনি। এতে কাজ না হলে শ্রমিকদের চাকুরীচ্যুত করার পাশাপাশি স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহনের হুশিয়ারী দেন।
এদিকে শনিবার মতবিনিয়ম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গতকাল রোববার কাউন্সিলরদের নিয়ে নগর ভবনে যাবার কথা ছিলো সিটি মেয়র আহসান হাবিব কামাল এর। বিষয়টি টের পেয়ে গতকাল রোববার সকাল ৮টার দিকে আন্দোলনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং মুজুরী ভিত্তিক শ্রমিকরা বিসিসি’র নগর ভবনের দুটি প্রবেশ দ্বারে ময়লা-আবর্জণা ভর্তি ট্রাক রেখে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে। পাশাপাশি নগর ভবনের দুটি গেট বন্ধ করে তার সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তারা। এর ফলে সকাল থেকে বেশ কয়েকবার নগর ভবনে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিলেও শেষ পর্যন্ত নগর ভবনে যেতে ব্যর্থ হয়েছেন মেয়র আহসান হাবিব কামাল সহ অন্যান্য কাউন্সিলরবৃন্দ।
অপরদিকে দীর্ঘদিন পরে গতকাল রোববার সকালে মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ বরিশালে আসেন। এসেই দেখতে পান কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শ্রমিকদের আন্দোলনে ফলে নগরীর বেহাল চিত্র। সাধারন নগরবাসীকে জিম্মি করে ময়লা আবর্জনা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন না করে আন্দোলনের ফলে ময়লার ভাগারে পরিনত হয় গোটা নগরী। তাছাড়া তিনি বরিশালে পৌঁছাবার পর পরই নগরীর বিভিন্ন এলাকার বসবাসকারী, ব্যবসায়ী সহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ ময়লার যন্ত্রনা থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে সহযোগিতা চান সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর কাছে। নগরবাসীর কথা রাখতেই তিনি পর্দার আড়ালে থেকে আন্দোলন থামাতে পদক্ষেপ নেন। নেপথ্যে থেকে সমস্যা সমাধানের বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিয়ে আয়োজন করেন সমঝোতা বৈঠকের।
তার প্রচেষ্টাতেই সর্বশেষ গতকাল রোববার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে নগরবাসীর দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে সমঝোতা বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বিসিসি’র এ্যানেক্স ভবনে অনুষ্ঠিত সমঝোতা বৈঠকে মেয়র আহসান হাবিব কামাল এবং সাবেক দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়র আলহাজ্ব আলতাফ মাহমুদ সিকদার, প্যানেল মেয়র কেএম শহীদুল্লাহ, মোশারেফ আলী খান বাদশা, শরীফ তাসলিমা কামাল পলি, জাকির হোসেন জেলাল এবং কাউন্সিলর আক্তরুজ্জামান হিরু, হাবিবুর রহমান টিপু সহ অন্যান্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) গোলাম রউফ খান, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এ্যাড. মানবেন্দ্র বটব্যাল, সাংস্কৃতিক সমন্বয় পরিষদের সভাপতি এ্যাড. এসএম ইকবাল, কোতয়ালী মডেল থানার ওসি শাহ মো. আওলাদ হোসেন ও মহানগর আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ সহ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া বিসিসি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘ বৈঠক শেষে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবী মেনে নেন সিটি মেয়র আহসান হাবিব কামাল সহ অন্যান্য কাউন্সিলররা। সেই সাথে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষনাও দেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
বিসিসি’র ২১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সাবেক দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়র আলতাফ মাহমুদ সিকদার বলেন, আমাদের পূর্বের ঘোষনা অনুযায়ী আন্দোলনরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ২ মাসের বকেয়া বেতন এবং ৫ মাসের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা পরিশোধের সিদ্ধান্ত হয়েছে। দৈনিক মজুরী ভিত্তিক শ্রমিকরাও ২ মাসের বেতন পাবেন। তাছাড়া চলতি মাসের ২৫ তারিখের মধ্যে নাগরিক সেবা দিয়ে বিসিসি’র যতটাকা আদায় হবে তার সব টুকুই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন বাবদ দিয়ে দেয়া হবে বলে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আনিছুজ্জামান বলেন, আমরা সাধারন নগরবাসীকে জিম্মি করতে চাই না। এতদিন আন্দোলনের কারনে নগর ভবন এবং এর বাইরে নাগরিক সেবা বন্ধ ছিলো। এতে তাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। এসব কথা বিবেচনা করে আওয়ামী লীগ, পুলিশ প্রশাসন এবং সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে আমাদের চলমান আন্দোলন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নিয়েছি। তবে যথাযথভাবে দাবী পুরন না হলে নতুন করে আন্দোলন কর্মসূচি দিবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা দীপক লাল মৃধা বলেন, নগরবাসীর কথা চিন্তা করে আমাদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। সেই সাথে গতকাল রোববার থেকেই পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা কাজে নেমে পড়েছে। সদর রোড সহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকার ময়লা আবর্জনা অপসারন শুরু করে দিয়েছে। আজ সোমবার দুপুরের মধ্যে ৩০ ওয়ার্ডের সকল স্থানে জমা পড়া ময়লা আবর্জনা সরিয়ে নেয়া সম্ভব হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বরিশাল মেট্রোপলিন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. গোলাম রউফ খান বলেন, মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ’র অনুরোধে আমি সমঝোতা বৈঠকে এসেছি। এমনকি কাউন্সিলর এবং মেয়রকে নিয়ে একটি সিদ্ধান্তেও পৌছেছেন। এখন আর কোন ঝামেলাও নেই।

Leave a Reply