» বড় ফ্যাক্টর ‘বরিশাল ইজম’: হচ্ছে না নানক-আলালের প্রতিদ্বন্দ্বিতা!

Published: ২১. নভে. ২০১৮ | বুধবার

অনলাইন ডেস্ক// গত ১০ বছর ঢাকা-১৩ (মোহাম্মদপুর-আদাবর) নির্বাচনী এলাকার রাজনীতি ঘুরপাক খেয়েছে অনেকটাই ‘বরিশাল ইজমকে’ কেন্দ্র করে। এলাকার নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত প্রায় সব বাসিন্দার মধ্যে বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের আধিক্য চোখে পড়ার মতো। এমন হিসাব-নিকাশের সূত্রেই বড় দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই নেতা এলাকায় অনেকটাই আপন হয়ে উঠেছিলেন মানুষের কাছে। এই দুই নেতা ঢাকায় যেমন একই এলাকায় নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী, আবার দুজনই বরিশাল শহরের একই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা। একজন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক। তিনি এই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী। আরেকজন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এবং এই এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে নানকের কাছে হেরে যান।

তবে এবারের নির্বাচনে এই দুই নেতাই এই আসনে মনোনয়ন ঝুঁকিতে পড়েছেন।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, জাহাঙ্গীর কবির নানক এবার ঢাকা-১৩ আসনে মনোনয়ন পাচ্ছেন না। তাঁর পরিবর্তে এখানে মনোনয়ন পেতে পারেন জাতীয় ক্রিকেটের ওয়ানডে দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। অন্যদিকে বিএনপির সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালকেও এই আসনে মনোনয়ন দেওয়া হবে না বলেই জোরালো আলোচনা চলছে দলের ভেতর।

গতকাল মঙ্গলবার মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকা ঘুরে সাধারণ মানুষ ও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। দলের দায়িত্বশীল পদে থাকা নেতারা সতর্কভাবে প্রতিক্রিয়া জানালেও সাধারণ কর্মীরা অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেছে নতুন কাউকে দেওয়ার বিষয়ে।

মোহাম্মদপুরের কাঁটাসুরের ভোটার সবজি বিক্রেতা আজিমুর রহমান বলেন, ‘আমরা তো ক্রিকেট খেলা বুঝি না, বড় কোনো খেলার সময় মাশরাফির নাম হুনছি, পোলাপানে হেরে লইয়া লাফালাফি করে, মাশরাফি নিজেও তো পোলাপান মানুষ, বড়রা কি হেরে খুশি মনে ভোট দিবো? এই এলাকার মানুষ নানক আর আলালরেই বেশি চিনে। হেই দুইজন ছাড়া তো ভোট জমবে না!’

৩৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের নেত্রী যাঁর হাতে নৌকা তুলে দিবেন তাঁকেই তো আমাদের মেনে নিতে হবে; কিন্তু বিষয়টিতে আমরা খুবই হতাশ। কারণ আমরা বছরের পর বছর ধরে স্থানীয় নেতাদের নিয়েই কাজ করেছি। সাধারণ মানুষ নৌকার পাশাপাশি নেতাকেও কিন্তু বিবেচনা করে। তরুণদের মধ্যে মাশরাফি যতটা জনপ্রিয়, মুরব্বিদের মধ্যে কিন্তু ততটা নয়। সুনাম-দুর্নাম যাই থাক গত ১০ বছরে নানক যেভাবে এলাকার রাস্তাঘাট, নালা-নর্দমার উন্নয়ন করেছেন সেটা তো নজিরবিহীন।’

ওই আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, ‘এলাকায় যেহেতু বরিশাল অঞ্চলের মানুষই বেশি, তাই এখানে নৌকার সমর্থকদের মধ্যে নানকের একটা প্লাস পয়েন্ট রয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যেও রয়েছে বিশেষ ভোট ব্যাংক; একজন দক্ষ সংগঠক বলেই নানক এটা সামলাতে পেরেছেন, মাশরাফির পক্ষে সেটা ধরে রাখা কঠিন হবে।’

স্থানীয় আওয়ামী লীগে নানকবিরোধী হিসেবে পরিচিত সাদেক খানের অনুসারী এক নেতা বলেন, মোহাম্মদপুর এলাকাটি রাজনীতির জন্য খুবই জটিল। এখানে স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী কাউকে না দিলে বিজয়ী হলেও দলকে সংগঠিত রাখা কঠিন হবে। এটা দলের জন্য খুবই ক্ষতি হবে।

২৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সলিমুল্লাহ সলু অনেকটা খোলামেলাভাবেই বলেন, ‘আমরা আমাদের দলের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের বাইরে যাব না। তিনি যাঁকে এখানে পাঠাবেন তাঁকে নিয়েই আমরা ভোট করব। কিন্তু সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে গত কয়েক বছরে জাহাঙ্গীর কবির নানক এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছেন, সেটা ভেঙে ফেললে আওয়ামী লীগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ তিনি বলেন, ‘স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে ক্রিকেটার মাশরাফি খাপ খাওয়াতে পারবেন না। ভোটে হয়তো তাঁকে আমরা জেতাব। কিন্তু দলের বিশৃঙ্খলা ঠেকানো যাবে না।’

যদিও একই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন অনেকটাই সতর্কভাবে বলেন, ‘আমরা দলের রাজনীতি করি, তাই দল বা নেত্রী যাঁকেই আমাদের হাতে তুলে দিবেন তাঁকে নিয়েই ভোটের মাঠে নামব। এটাই শেষ কথা।

অন্যদিকে যুবদলের একজন সহসভাপতি, যিনি মোহাম্মদপুরের বাসিন্দাও, তিনি বলেন, ‘আমরা শুনেছি এই এলাকায় মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের বিরুদ্ধে আমাদের আরেক নেতা ম্যাডাম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা আব্দুস সালাম চেষ্টা করছেন মনোনয়নের জন্য। কিন্তু এখানকার বাস্তবতা হচ্ছে—মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের অবস্থান সাধারণ কর্মীদের মধ্যে বেশ ভালো। বিশেষ করে বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের মানুষ বেশি থাকায় ভোটে প্রভাবও তাদের বেশি থাকে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে সালামের চেয়ে আলাল অবশ্যই এগিয়ে আছেন।’

৩২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির আরেক নেতা বলেন, ‘আমরা এমনও শুনেছি এখানে আলালকে সরিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কাউকে দেওয়া হতে পারে। সেটা হয়তো আমরা দলের স্বার্থে ওপরে মেনে নিব। কিন্তু সাধারণ মানুষ তো সেটাকে সহজে মেনে না-ও নিতে পারে।’

জুহরি মহল্লার ফল বিক্রেতা মোহাম্মদ বিল্লাল বলেন, ‘আমরা এখানে নানক-আলালের বাইরে তেমন কাউরে সমর্থন করতে দেখি না। নতুন কাউকে দিলে দুই দলের জন্যই কঠিন হবে। ভোটে তেমন আনন্দ থাকবে না।’